Published Date:10-10-2021
1592716883.jpg?v=55779014

গল্প

বিনিময়ের দূরত্ব

মলয় মজুমদার

মানুষের স্মৃতির রূপ অনেক । কখনো ডুবিয়ে নিয়ে যায় অন্ধকারে । কখনো ভাসায় আলোতে । কমলাকান্ত তা বুঝেছে তার ছাপ্পান্ন বসন্তে । কখনো মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে । কখনো ভাসিয়ে নিয়ে যায় কাব্যের ছন্দে । আলো আসে । কালো আস্তরণ সরে যায় ।  কমলাকান্তের জীবনভর গল্পটা অনেকটা সেই রকম ।  আবার স্মৃতিতে কালো দাগ পড়ে । যখন হঠাৎ মানুষটার কপালের সিঁদুরটা মুছে যায় । কালো দাগ  রঙিন হয় না । কালো দাগ আর হাস্যময় চোখের ঝিলিক, কমলাকান্ত আজ একাকার । দুটোই গভীর । দুটোই মনের মাঝে । কথা বলে । সব দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, আঘাত, সব সরিয়ে দেয়  । থাকে শুধু চোখের হাসির ঝিলিক আর কালো দাগ । এই দুই অধ্যায় জুড়ে থাকে কমলাকান্তের কাহিনী ।

 

অফিস ছুটি হয়ে গেলেও  কমলাকান্ত বাড়ি ফিরতে দেরী করে । অফিস শেষ করে সে ঘুরে বেড়ায় । এদিক ওদিক । কোন নির্দিষ্ট দিক নেই । যখন যেদিকে মন চায় । পায়ে হেঁটে । বাড়ি ফেরার তাড়া নেই । অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হয় । হ্যান্ড ব্যাগ থেকে মদের বোতলটা বের করে । টেবিলে রাখে । জলের জগ ও একটা গ্লাস আগের থেকেই রাখা থাকে   টেবিলে উপর । ছোলা-বাদামের প্যাকেটটা খোলে । ফেরার পথে কোনদিন আনতে ভোলে না । একমুঠো মুখে দেয় । কিছুক্ষণ চিবোয় । তারপর জলের সাথে পুরোটা একবারে গিলে ফেলে । প্রতিদিন একই রকম । বহুদিনের অভ্যাস । বিয়ের পর পর অন্য রকম ছিল । তখন সে প্রতিদিন মদ খেতো না । যেদিন খেতো  স্নিগ্ধা কখনো মাছ ভাজা  কখনো অমলেট করে দিতো । ছোলা বাদাম থাকতো সাথে । এখন আর সে সব নেই । আশাও নেই । স্নিগ্ধা আছে । দূরত্ব বেশি না । একটা ঘর পার হলেই স্নিগ্ধার ঘর । কমলাকান্তের বউ স্নিগ্ধা । দুই মেয়ের মা । প্রথম সন্তান তিস্তা, বিয়ে হয়ে গেছে দু বছর হলো । কিছুদিন আগে মা হয়েছে সে । দ্বিতীয়জন মল্লিকা, এবার কলেজে । এবারই শেষ বছর ।   স্নিগ্ধাও বেশ লম্বা । চোখমুখ বেশ সুন্দর । গাঁয়ের রঙটা শ্যামলা । অনেকের কাছেই বেশ আকর্ষণীয় এখনো । দুজনের বয়সের পার্থক্য পাঁচ ।  

  বাড়িটা অনেক বড়ো । লোক কম । চাকরীটাও অনেকদিন হলো । ক্লার্ক হিসাবে জয়েন করেছিল । এখন প্রথম শ্রেণীর কর্মচারী । আর মাত্র বছর খানেক । তারপর অবসর । শিলিগুড়িতে চাকরি করতে এসে বাবা আর দেশে ফেরেনি । এখানেই থেকে গেছে । যদিও চাকরিটা শেষ পর্যন্ত করা হয়নি । রাজনীতির ঝামেলায় জড়িয়ে । তারপর ব্যবসা করেছে । ব্যবসা শুরু করার পাঁচ বছরের মাথায় এই বাড়িটা । কিন্তু বেশিদিন বাড়িটা ভোগ করতে পারেনি । কমলাকান্ত যখন একুশ , একটা দুর্ঘটনায় মা বাবা দুজনেই মারা যান । বাবা খুব শৌখিন ছিলেন । বাড়িটা দেখলে বোঝা যায় ।  এক দিদি । বাবা মা চলে গেলে দিদিকে আঁকড়ে ছিল । কিন্তু বেশিদিন পারেনি । বিয়ে করে সোজা কানাডা । তেইশ বছরে সে একা । ছাপ্পান্ন থেকে তেইশ । এই কটা বছর । কতদিন সে তার জীবনকে ঠিক করে উপভোগ করেছে । জানে না সে । খুবই সামান্য । পাঁচ কি ছয় বছর হবে । তারপর সেই গতানুগতিক । চুপ থাকলেও দোষের, কিছু বললেও দোষের । দীর্ঘদিন একই ভাঙা রেকর্ড ।  ভুলটা কোথায় , বুঝতে পারেনি এখনো । তবে কোথাও যেন হিসেবের গরমিল ছিল । কোন একটা জায়গাতে । শরীরে না মনে । অথবা সেই স্মৃতিতে ! 

  ভেতরের ঘর থেকে ভেসে এলো হাসির কলরব । কমলাকান্তের অবাক লাগলো । আজ কারো কি আসার কথা ছিল । জানা নেই । কেউ বলেনি কিছু । অফিস যাবার সময় , বা অফিস থেকে ফেরার পর, কারো সাথে কথা হয় না । মাঝে মাঝে মল্লিকা আসে । কলেজের ফিস বা অন্য কোন খরচের জন্যে । টাকা নিতে । মাসে একবার স্নিগ্ধার সাথে কথা হয় । মাসের খরচের ফর্দ নিয়ে ।   এছাড়া সকালে ও রাতে খাবারের থালা নিয়ে আসে । কখনো মল্লিকা, কখনো স্নিগ্ধা । কখনো বাড়ির কাজের মেয়েটি । দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব নিয়ে সে দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো । এগিয়ে দেখবে কি দেখবে না, ঠিক করতে পারছে না । তবু সে এগিয়ে গেলো । পর্দার আড়াল থেকে তিস্তাকে দেখতে পেলো । আর দু’পা এগোতেই , ঘরের ভেতরটা পুরোটা চোখে পড়লো । অনেকে এসেছে । তিস্তা, তিস্তার স্বামী বিকাশ, স্নিগ্ধার ছোট মামা গোপাল সরকার । তিস্তার সাথে চোখাচোখি হলো । কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলো । নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করেছে । কমলাকান্তর মত ছিল না । স্নিগ্ধার অমত ছিল না । কমলাকান্তের নাপসন্দ ছিল । স্নিগ্ধা পাত্তা দেয়নি । সেই থেকে তিস্তার সাথে একটা দূরত্ব । আজো আছে । যেমন এসেছিল, তেমনই আবার ফিরে এলো নিজের ঘরে । রাতে খাবার নিয়ে এলো মল্লিকা , যেতে যেতে শুধু বললো,’খেয়ে নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে’ । শুনেছিল মেয়েদের আকর্ষণ বাবার প্রতি বেশি হয় , কিন্তু কমলাকান্তের সেটা দেখা হলো না কোনদিন । 

(২)

 

ঊনত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবন । চাকরিটা পাবার পর একদিন স্নিগ্ধা বলেছিল,”আমরা কি সম্পর্কটা আরো একটু গভীর করতে পারিনা ?” হঠাৎ এই কথাতে কমলাকান্ত অবাক । বন্ধুত্বটা তেমন বেশিদিনের না । একটা ফাংশনে পরিচয় । দেখে ভালো লেগেছিল । কিন্তু সেভাবে ভাবনা আসেনি । তখন মনে ছিল মিলির চোখের হাসি । যা কখনো অতীত হয়নি । স্নিগ্ধার  সে প্রস্তাবের পর কেটে গেছে এক বছর । খুব একটা দেখাও হয়নি । কিন্তু  প্রায় এক বছর পর  একদিন স্নিগ্ধা বাড়িতে হাজির । সেই শুরু । তারপর আজ পর্যন্ত স্নিগ্ধাই তার জীবনে । কিন্তু মিলি আজো কমলাকান্তের অনুভবে ।  

 কিছুই গোপন রাখতে পারেনি কমলাকান্ত । ছোট ছোট ঘটনা । না বললেও হয় । কিন্তু গোপন রাখতে পারে না । মিলির প্রতি তার যে অনুভব । সে অনুভবও খুলে দিয়েছিল স্নিগ্ধার কাছে । মিলিকে যে তার খুব পছন্দ ছিল । মিলি বিয়ের আগের দিন তার কাছে এসেছিল । বলেছিল “তুমি খুব ভীতু কমলদা । একবার মুখ ফুটে বললে না “। মিলির চোখের হাসি । মিলির সাথে শেয়ার করা কথাগুলো । কিছুই গোপন রাখতে পারেনি । বিশেষত যেদিন মদ খেয়ে মাতাল হতো । মিলিকে মনে হতো খুব বেশি । আর সেই সময় বেজে উঠতো স্নিগ্ধার ফোন ।  মিলি আর স্নিগ্ধার দ্বন্দ্ব । নেশার মধ্যে অনেক আবেগ ভাসতো । যেগুলো কখনো ফেরানো যেতো না । তার খেসারত আজো দিতে হয় । মাঝে মাঝে জ্বলে উঠতে চায় কমলাকান্ত । কিন্তু মিলির চোখের চাউনি ভেসে ওঠে । সব রাগ নিভে যায় । নিমেষে  শান্ত সে  ।

 

 এখন সে নেশাতেই বাঁচে । প্রতিদিন মাতাল হয় । তারপর চোখে ঘুম আসে । আবেগে ভাসে মন ।

মনে মনে মিলির সাথে কথা বলে । তবে বিয়ের আগে এতোটা মাতাল ছিল না সে । মদ খেতো , কিন্তু অনেক কম । কিন্তু এখন তার সামনে কিছু নেই । শুধু স্মৃতি । পাশে আর স্নিগ্ধা থাকে না । একদিন বমি করে বিছানা নষ্ট করেছিল । সেদিনই প্রথম ও শেষ । কানাঘুষোতে জানতে পেরেছে,খাবারের সাথে মেশানো ছিল মদ ছাড়ানোর ওষুধ । তাতেই বিপত্তি । পরের দিন থেকে বিছানা আলাদা ।

    ঘড়িতে রাত দেড়টা । কমলাকান্তের ঘুম ভেঙে গেলো । শরীরে অদ্ভুত অস্বস্তি । মাথাটা ভারি হয়ে আছে । ঘুমানোর চেষ্টা করে । ঘুম আসে না । এপাশ ওপাশ করে খানিকক্ষণ । জলের জগ থেকে জল খায় । চুপচাপ বিছানায় পড়ে থাকে, কিন্তু ঘুমোতে পারে না । বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে করিডোরে দাঁড়ায় । ছোট মেয়ের ঘরে তখনো টিভি চলছে । স্নিগ্ধার ঘর অন্ধকার । কিন্তু জেগে আছে । ভেন্টিলেটর দিয়ে মোবাইলের আলো দেখা যাচ্ছে । আজকাল স্নিগ্ধা ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে । বারান্দার গেট খুলে উঠোনে এসে দাঁড়ায় । বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে উঠোন । সারাজীবনের অপূর্ণতা গুলো কেমন যেন । স্মৃতির হাত ধরেই জীবনটা চলে গেলো । বাবা মা মারা যাবার পর দিদিকে জাপটে ছিল । কিন্তু সেটাও ক্ষণস্থায়ী । তারপর স্নিগ্ধা এলো । ভালো লাগা এলো ধীরে ধীরে । কিন্তু সেটাও কখন যেন চলে গেলো । কেন গেলো ? বুঝতে পারে না । মদের জন্যে ? মিলির জন্যে ? এগুলো তো তার আগের থেকেই  ছিল ! বিয়ের আগেই তো মিলির কথা বলেছিল ! বারে বসে স্নিগ্ধার সামনে কতদিন মদ খেয়েছে  ! স্নিগ্ধা খাবার খেতো, আর কমলাকান্ত মদ ! তাহলে তখন কেন এই ভালোলাগা নষ্ট হয়নি ? প্রশ্ন আছে । অথচ উত্তর নেই । চাঁদের মুখোমুখি আজ তার জীবন বিনিময়ের হিসেবে , পুরোটাই অপূর্ণ । 

  

(৩)

     অফিস থেকে বেরিয়ে কমলাকান্ত হাঁটে । হেঁটে এসে রেলের ওভারব্রিজের উপর দাঁড়ায় । জায়গাটা তার ভালো লাগে । স্নিগ্ধাকে এনেছিল একদিন । ছবি তুলেছিল অনেক । ছবি তুলতে ভালো লাগে তার । চেহারাটা খুব একটা ভালো না । তবে বেশ লম্বা । প্রায় ছয় ফিটের কাছাকাছি, কালো গাঁয়ের রঙ, চোখ দুটোর আকারে ছোট ।  নাকটা কেমন যেন লম্বাটে । মোটা ।  পেটানো শরীর । । এখন একটু মেদ জমেছে ঠিকই   ।  কিন্তু খুব একটা বোঝা যায় না । সারাদিন যেখানেই যায় , হেঁটে যায় । শুধু স্নিগ্ধাকে নিয়ে কোথাও গেলে, বাইকটা বের করে । অনেকদিন হয়ে গেলো, স্নিগ্ধার সাথে কোথাও যায় না । এতোদিনে বাইকটা জং ধরে গেছে । বছর তো কম হলো না ! বাইকটা ব্যবহারই হয় না । 

সেই প্রথমদিন ছিল দুজনে । আজ একা । মনের মধ্যে শূন্যতার ঢেউ । কিন্তু সেই ঢেউয়ে কখন যেন মিলি এসে দাঁড়ালো । হাসির ভাষা নিয়ে চোখে । একটা ঢেউয়ের ঝিলিক । হঠাৎ মিলিয়ে গেলো । সামনে এলো মিলির সিঁদুর হীন কপাল । বিয়ের সাত বছরে বিধবা । দেখা হয়েছিল একবার মার্কেটে । মিলির চোখে হাসি ছিল না । আড়ষ্ট । বিমর্ষ । কিন্তু সেই চোখেও ভাষা ছিল । বলতে পারেনি । আজো সেই ভাষার খোঁজে, সে হাঁটে । খোঁজে সেই ভাষার শব্দগুলো কমলাকান্ত ।

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন