গল্প
তবু অন্ধকার
অলোক গোস্বামী
রিং টোনের শব্দে চমকে উঠে বুক পকেটে হাত দিয়েই অভয়ের মনে পড়ে যায় কাল বিকেল থেকেই যন্ত্রটা সুইচ অফ করে রাখা আছে । পৌঁছে যাবার পর চালু করার কথা ভেবেছিল বটে কিন্তু সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছে ।
তবে বুক পকেটে যখন হাত দিয়েইছে তখন একবার পরখ করে দেখে নিতে ক্ষতি কী ! যে যন্ত্র নিজে থেকেই অফ হয়ে যেতে পারে,কে জানে,সে নিজে থেকেই চালু হয়ে যাওয়ার মতো ভৌতিক ক্ষমতা রাখে কিনা !
এসব ঝামেলার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যই মোবাইলটা কায়দা করে ফেলে আসতে চেয়েছিল অভয় কিন্তু শেষ মুহুর্ত্বে বীথির শিকারি চোখ এড়ানো যায়নি ।
--আচ্ছা তালকানা ! দরকারি জিনিষটা ফেলে রেখে হাবিজাবি দিয়ে ব্যাগ ভরিয়েছ ?
--ধুর, কী হবে ওটা দিয়ে ? নেট ওয়ার্ক পাওয়াই যাবে না । অহেতুক বোঝা বওয়া । শেষমেষ হারিয়ে ফেলি যদি !
সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে এসেছে বীথির তীক্ষ্ণ জবাব,‘কিছুই হারায় না যদি না আমরা সেটাকে হারিয়ে যেতে দেই । সেটা কোন বস্তু হোক বা নিজেকে ।’
এরপর কথা বাড়ানোর সাহস কুলিয়ে উঠতে পারেনি অভয় । কিম্বা চায়নি ।
মোবাইলের স্ক্রিনটা অন্ধকার থাকা সত্বেও এলোপাথারি কয়েকটা বোতাম টিপে পরখ করে নেয় অভয় এবং এই নিশ্চিন্ততা বজায় রাখতে বীথিকে পৌঁছানোর সংবাদ জানানোর সিদ্ধান্তটা বাতিল করে দেয় । কে জানে বীথির কথার ধাঁধাঁ সামলানো যাবে কিনা ! উটকো ঝামেলা বাঁধতে কতক্ষণ ? ফিরে গিয়ে নেটওয়ার্কের কাঁধে দোষ চাপালেই হবে ।
--কী দেখছ ? ওটা তোমার রিং টোন নয় ।
মোবাইল সংক্রান্ত দুশ্চিন্তায় কণার উপস্থিতির কথা ক্ষণেকের জন্য ভুলেই গিয়েছিল অভয়, আলটপকা ফোড়নে সম্বিত ফেরে বটে কিন্তু মেজাজ বিগড়ে যায় । যাওয়াটা স্বাভাবিকও । কারণ এই মন্তব্যেই তো প্রমাণিত, অভয় নিজস্ব রিং টোন চিনতে পারেনি । অর্থাৎ সে ঘাবড়ে গিয়েছিল । অর্থাৎ অভয় ভিতু । অর্থাৎ এখানে আসার ব্যাপারে এতদিন কণাকে সে মিথ্যে সাহস জুগিয়েছে ।
এসবের চে’ও কঠিন যে সত্যটা প্রমাণিত হয় তাহলো রিং টোনের শব্দে অভয়ের চমকে ওঠা, মোবাইল বের করে যাচাই করে নেয়া, সর্বোপরি অফ অবস্থাতেই বুক পকেটে রেখে দেয়া, এসব দৃশ্যগুলোর কোনটাই কণার দৃষ্টি এড়ায়নি । অর্থাৎ একটা নেটওয়ার্ক থেকে রেহাই পেতে এসে অভয় আরেকটা নেটওয়ার্কের ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে পড়েছে ? ওফ, কী সাংঘাতিক ! তাহলে এত ঝুঁকে নিয়ে এভাবে বেড়িয়ে পড়া কেন !
আচমকাই অভয়ের নজরে পড়ে যায় কণার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা মুখ খোলা দশায় একদিকে কাত হয়ে রয়েছে । যে কেউ ইচ্ছে করলেই ব্যাগের ভেতর থেকে জিনিশ উঠিয়ে নিতে পারবে । কণা টেরও পাবে না ।
-- অন্যের ওপরে গোয়েন্দাগিরি না করে নিজেকে সামলাও । ওফ, এত ক্যালাস তুমি !
কণা যথারীতি বুঝতে পারে না এহেন সম্ভাষণের গূঢ় অর্থ । হকচকিয়ে তাকায় নিজের বুকের দিকে, আঁচল কি সরে গিয়েছে !
বাধ্য হয়েই অভয়কে আঙুল তুলে ব্যাগটা দেখাতে হয় কিন্তু তড়িঘড়ি ব্যাগটা বন্ধ করার পরিবর্তে কণা ব্যাগের ভেতর কী যেন খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ! অভয় বোঝে ব্যাগ খোলা থাকাটা বোকামোর লক্ষণ নয় । কিছু একটা খুঁজছিল কণা । বরং আতঙ্কের ঘোরে আটকে থেকে অভয় সেসব কিছু খেয়ালই করেনি । শুধু ব্যাগ খোলা কেন, তারচেও সত্যিটা হলো যে বাস থেকে নামা ইস্তক কণার অস্তিত্বের কথাটাই ভুলে গিয়েছিল অভয় । অথচ কণা ঠিক উল্টোটা করেছে । আঁকড়ে ধরে আছে অভয়কে ।
এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল । সুতরাং নিজের খেলাপি আচরণে লজ্জিত হয় অভয় । অহেতুক রূঢ় ব্যবহার করা হয়েছে এবং ডোজটার পরিমাণ যে খুব কম ছিল না তার সাক্ষাত প্রমাণ বাস থেকে নামা মাত্র যে দালালটা পাকড়াও করেছে সে ব্যাটার চোখেমুখেও বিস্ময়ের জলছাপ ।
এক্ষেত্রে বীথি হলে অবধারিত ফেঁসে যেত অভয় । কারুর দিকে না তাকিয়েও বীথি বুঝে যেত, কত জন এই অপমানের সাক্ষী । অথচ তাদের আরও রসদ জোগাতে অভয়কে লক্ষ্য করে একের পর এক মিসাইল ছুঁড়ত । ব্যাপারটা যে নিছক দাম্পত্য শোভন খুনসুটি, সেটা প্রমাণ করতে ফ্যাকাশে হাসিতে মুখ এঁটো করে রাখলেও শেষ রক্ষা হোত না । এরপর বীথি হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিতো । পাবলিক হাসিয়ে বীথির পিছুপিছু ছুটতেই হোত অভয়কে ।
যা হোত, হোত । এই মুহুর্ত্বে ওসব চিন্তা শুধুই অপ্রাসঙ্গিক নয়, কুরুচিকরও বটে । কণা যে বীথি নয় সে তো জানা কথাই । নাহলে আসা কেন ? তাবলে কারও ভালোমানুষির সুযোগ নেয়াও অন্যায় ।
পাপস্খালনের উদ্দেশ্যে অভয়কে মোলায়েম স্বরে জানতে চাইতেই হয়,‘কী খুঁজছ ?’
--যাক বাবা, ভুলিনি । নিয়ে এসেছি ।
কণার স্বরে ভেসে ওঠা আমোদে স্বস্তি পাবার পরিবর্তে শঙ্কিত হয়ে ওঠে অভয় ।
--কী জিনিষ !
শঙ্কিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণও রয়েছে । কাল বাসে যা বিপদে ফেলেছিল কণা !
নামে লাক্সারি শব্দটা জোড়া থাকলেও বাসটা তেমন দেখনদারি ছিল না । অবশ্য সেটাই ছিল অভয়ের কাছে অনেক কিছু । মস্ত জানালা, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত না হওয়ার কারণে কাচ খোলার স্বাধীনতা ছিল । এটা কি কম প্রাপ্তি ? সর্বোপরি তেমন ভিড়ও ছিল না । এর থেকে বেশী লাক্সারি আর কী হতে পারে ! সুতরাং এরপর নিশ্চিন্তে নিজের সঙ্গে বাইরে চলন্ত জীবনের টুকরো টাকরা মনে মনে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে যেতে অসুবিধে হয়নি অভয়ের ।
সূর্য সবে অস্ত যাওয়ায় আলোর পাট তখনও ফুরোয়নি । তবে তোড়জোড় শুরু হয়ে ছিল । চাপা গুমোট কাটিয়ে বেশ আমেজি হাওয়া বইতে শুরু করেছিল । কে জানে, আসার পথে বাতাসটা কোন বৃষ্টি ভেজা অঞ্চল পেরিয়ে এসেছিল কিনা ! খানিকটা ভেজা ভাব, খানিকটা সোঁদা গন্ধ দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছিল । ব্যস, এরপর পায় কে অভয়কে! পুশব্যাক সিটটাকে খানিকটা হেলিয়ে, কণার থেকে নজর সরিয়ে, বাইরের চলমান খন্ড দৃশ্যগুলো দিয়ে একটা কাহিনি চিত্র বানানোর চেষ্টা শুরু করেছিল ।
যেমন, ক্ষেত চিরে এগিয়ে আসছে যে রমণী তার শরীরের অদ্ভুত মাদকতা । অথচ হাঁটার ভঙ্গীতে আলস্য । একেই কি মদালসা বলে ? ওই আলস্যটুকু জোগার করতে কার কাছে গিয়েছিল ওই নারী ?
গাছের নীচে সাইকেলে ভর রেখে অন্যমনস্ক দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীটি কি কারও অপেক্ষায় ছিল ? নাকি যে সম্পর্কটাকে গতরাতের স্বপ্নেও অটুট দেখেছিল, সেটা খানিক আগে কাচের চুড়ির চেয়েও মসৃন ভাবে ভেঙে যেতে দেখে হতবাক হয়ে পড়েছে ! এখন কী ভাবছে, সাইকেল সহ কোন উন্মত্ত ট্রাকের মুখোমুখি দাঁড়াবে কিনা !
রাস্তার পাশে যে লোকটা তারস্বরে চিৎকার করছিল সে যে কোনও দাঁতের মাজন কিংবা স্বপ্নাদ্য মাদুলীর বিক্রেতা নয় সেটা এক পলকেই মালুম করতে অসুবিধে হয়নি । এবং জমায়েতের সংখ্যা থেকেই প্রমাণিত বক্তা শাসকদলের কিংবা প্রধান বিরোধী দলের কেউ নয় । হতেই পারে যারা এখনও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে এবং দেখাতে চায়, তাদের কেউ । আচ্ছা, লোকটা পরিতোষ ছিল না তো ! মুখের ছাঁদে কোথায় যেন মিল ছিল । মাঝপথে কলেজ ছেড়ে ব্যাটা কোথায় যে উধাও হয়েছিল কেউ জানতে পারেনি । হোতেই পারে, এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছে । হয়ত এখনও লড়ে যাচ্ছে, হাল ছাড়েনি । আচ্ছা, বাস থেকে নেমে যদি সামনে গিয়ে দাঁড়াতো অভয় ? বক্তৃতার ঘোরে থাকা পরিতোষ নির্ঘাত খেয়াল করতো না । সভা সাঙ্গ করে যখন ফেরার পথ ধরতো তখন যদি অভয় গিয়ে পরিতোষের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতো, কেমন আছিস ?
একদিন পাশে না পাওয়ার অভিমানে কি না চেনার ভান করতো পরিতোষ ? নাকি বুকে জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়ে যেত বাড়িতে ? কে কে থাকতো বাড়িতে? শীর্ণ চেহারা, হাতে শাঁখা পলা সম্বল অকালে বুড়িয়ে যাওয়া স্ত্রী ? হঠাৎ জুটে যাওয়া কাকুটিকে দেখতে যে ছেলে মেয়ে দুটো ছুটে আসত তাদের পোষাক ধোপদুরস্ত থাকতো ? চোখ দুটো কি পরিতোষের মতই ভাসা ভাসা হোত ?
হঠাতই বাইরে অন্ধকার এবং বৃষ্টি যুগপৎ নেমে আসায় এরপর অভয় বাধ্য হয়েছিল জানালা বন্ধ করে চলচিত্রের সমাপ্তি ঘটিয়ে ভেতরের দিকে নজর দিতে । যাত্রীরা বেশীর ভাগই চোখ বুঁজে ঝিমুচ্ছিল । কণাই শুধু কোলের ব্যাগটাতে কিছু একটা খোঁজার লক্ষে আঁতিপাতি ব্যস্ত ।
হঠাৎই আর্কিমিডিসিয় কায়দায় ডুকড়ে উঠেছিল কণা, যাক বাবা, ভুলিনি, নিয়ে এসেছি ।
এহেন প্রাপ্তিযোগের প্রতি তীব্র উদাসীনতা থাকা সত্বেও নিছক শব্দের ঘাতে চোখ ফেরাতে বাধ্য হয়েছিল অভয় । ঘাড় অবশ্য বেশী ঘোরাতে হয়নি । কারণ তার বুক ঘেঁষেই ছিল অঞ্জলীর ভঙ্গীতে পেতে রাখা ফর্সা দুটো হাত এবং চেটোর মাঝখানে ছোট্ট একটা কৌটো ।
অবাক হয়েছিল অভয় । কী আছে ওটায়, কণার প্রাণ ভোমরা ! কিন্তু সেটা এমন আনুষ্ঠানিক ভাবে হাতে তুলে দিতে চাইছে কেন ? সেটা তো কবে থেকেই অভয়ের মুঠিতে !
--সিঁদুর । আসার সময় আমার তো মনেই পড়েনি । ভাগ্যিস কয়েকদিন আগে ব্যাগে ভরেছিলাম !
বাসটা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত না হওয়ার ফয়দাটা ফের একবার টের পেয়েছিল অভয় । দমকা বৃষ্টি এবং যন্ত্রের কুচোকাচা শব্দ বাসের ভেতর যে গুঞ্জন সৃষ্টি করেছিল তাতে সবার কানে কথাগুলো পৌঁছনর কথা নয় । তাবলে কি কাছেপিঠে বসা মানুষগুলোর কান এড়ানো গিয়েছে ?
নিশ্চিত না হোতে পারার কারণে এরপর অভয়ের সাহস হয়নি কথা বাড়ানোর । যে তৃপ্তি নিয়ে কণা তাকিয়ে ছিল তাতে ওর চোখের দিকে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকাটাও সম্ভব হয়নি । অগত্যা অভয় ফের মুখ ঘুরিয়েছিল বাইরের দিকে । কিন্তু সেখান থেকেও স্বস্তি আসেনি । অন্ধকারেও চোখে পড়েছিল বাসের কাচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলকণাগুলো লাল বর্ণ ধরেছে । মনে হয়েছিল, আকাশ কি কণার বন্ধ কৌটো থেকে সিঁদুর চুরি করে সারা শরীরে মেখেছে ?
এখন গন্তব্যে পৌঁছে যাবার পর কণার ঠোঁটে ফের সেই এক ডায়ালোগ শুনে অভয়ের শিউড়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক । এবার কি খুঁজে পেল বোকা মেয়েটা, কন্ডোম ? যদি তেমন কিছু হয় তবে এই পরিবেশে, বিশেষ করে দালালটার সামনে রীতিমত আত্মহত্যার সমতুল্য কাজ হয়ে যাবে ।
কণাকে আড়াল করতে দু-পা এগিয়ে যেতে চায় অভয় কিন্তু বাদ সাধে দালালটা । কণার খুঁজে পাওয়া বস্তুটা দেখার আগ্রহে সেও খানিকটা ঘেষে আসে । আত্মরক্ষার তাগিদে এরপর রুখে উঠতেই হয় অভয়কে ।
--এভাবে সেঁটে আছেন কেন ? বললাম তো, প্রয়োজন নেই হোটেলের !
নাটক, সিনেমায় যে ধরণের দালাল দেখা যায় এই লোকটি যে তেমন কেঁচো ব্যক্তিত্বের নয় সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় প্রত্যুত্তরে ।
-- কী যে বলেন স্যার ! বেড়াতে বেরুনোর আসল মজা তো হোটেলেই ।
মানে কি এ ধরণের কথার! রাগে শরীর রী রী করে ওঠা সত্বেও চেপে যায় অভয় । কারুর সঙ্গে হাতাহাতি তো দূরস্থান, ঝগড়া করার স্পৃহাটুকুও কোন কালে ছিল না । এখন,এই পরিবেশে তেমন কিছু করার তো প্রশ্নই ওঠে না । মজার খোঁজে দু-পাঁচজন এসে জুটবে বটে কিন্তু সমর্থন মিলবে না । কেননা দালাল তো চাইবেই খরিদ্দার পাকড়াতে, তাতে দোষ কিসের !
অভয় বোঝে, লোকটাকে যেভাবেই হোক এড়াতেই হবে কিন্তু কিভাবে বুঝে উঠতে পারে না । হঠাতই এগিয়ে এসে মুশকিল আসান করে দেয় কণা । ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে বলে,‘ এটা রাখুন । আপনার সাহায্য লাগবে না । আমাদের হোটেল বুক করা আছে ।’
লোকটা লোভী চোখে তাকায় বটে নোটটার দিকে কিন্তু হাত বাড়ায় না ।
--কোন হোটেল ?
--সী ভিউ ।
রীতিমত ধমকের স্বরে কথাগুলো বলে নোটটা দালালের হাতে গুঁজে দিয়ে কণা কন্ঠস্বরে একই কর্তৃত্ব বজায় রেখে অভয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,‘খামোখা দেরী করছো কেন? চলো ।’
কণা তো বলেই খালাস কোথায় যাবে অভয় ! কোন দিকে সী ভিউ হোটেল ? বুক করলই বা কে ? কণা কি অফিসের কাউকে দিয়ে বুক করেছে ? আগাপাস্তলা না জেনে কি কেউ সাহায্য করেছে ? কণা কি পেরেছে গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলতে ? এতদিন এই ব্যর্থতাটাই কণা ঘোষালকে অফিসে ভবেশ ঘোষালের স্ত্রী হিসেবে রয়ে যেতে সাহায্য করেছে । দু বছর পেরিয়ে যাওয়া সত্বেও মৃত সহকর্মীর স্ত্রীকে নিয়ে রসালো কেচ্ছা ফাঁদার মতো সাহস অফিসের কেউ দেখাতে পারেনি । কিন্তু এরপর ?
অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে কণা কিন্তু অভয়ের পা দুটো জগদ্দল পাথর । এগোতে পারছে কোথায় ! দালালটা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে অভয়ের দিকে ।
একটা রিক্সো ডেকে চেপে বসে কণা । ঘাড় ফিরিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকে,‘কী হলো, এসো !’
এতক্ষণে সাহস ফিরে পায় অভয় । ছুটে গিয়ে রিক্সোয় বসতে বসতে হিসহিসিয়ে ওঠে,‘কে ঠিক করে দিলো হোটেল ?’
--এই নাও, চ্যিউইংগাম চেবাও । ব্যাগের ভেতর এটাই খুঁজছিলাম । ভেবেছিলাম বাসে খাবো, মনেই ছিল না ।
কণা কি প্রশ্নটা শুনতে পায়নি ? নাকি বকুনি খাবার ভয়ে এড়িয়ে যাচ্ছে ! কিন্তু অভয়ের পক্ষে তো সম্ভব নয় এড়িয়ে যাওয়া । তবু চটে ওঠার বদলে করুণ গলায় জিজ্ঞেস করে,‘কে হোটেল বুক করে দিলো ?’
অবাক চোখে তাকায় কণা ।
--কোন হোটেল !
--সী ভিউ !
--সেটা কোথায় !
কণার হেঁয়ালিতে মাথা টলমল করে ওঠে অভয়ের ।
--তোমারই তো জানার কথা ।
--না বললে লোকটা অত সহজে ছেড়ে দিত ?
রিণরিণে হাসিতে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে কণা যে বিস্ময়ে ঘুরে তাকায় রিক্সোওলা । বিরক্তি মাখানো স্বরে অভয়,‘ কী দেখছ ! একটা ভালো হোটেলে নিয়ে চলো ।’
(দুই)
ডোরবেলের শব্দে অভয় ভেবেছিল হয়ত বেয়ারা ব্রেকফাস্টের কাপ প্লেটগুলো নিয়ে যেতে এসেছে কিন্তু দরজা খুলেই চমকে ওঠে । বাসস্ট্যান্ডের সেই দালাল, হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ।
--আপনি এখানে !
অভয়ের বিরক্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে দালালটা মুচকি হাসে ।
--আমারই তো এখানে থাকার কথা স্যর । আমি তো এই হোটেলটার কথাই বলেছিলাম । ম্যাডামই তো বললেন....।
কথা শেষ না করে অভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে দালালটা । অপ্রস্তুত হোতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় অভয় ।
--গিয়েছিলাম সেই হোটেলে । ঘর পছন্দ হয়নি ।
কথাটা পুরো মিথ্যে নয় । সমুদ্রের কোলঘেঁষা হোটেলগুলো পুরো ভর্তি ছিল । একটু ভেতরের হোটেলগুলোর ঘর সত্যিই পছন্দ হয়নি । ভাগ্যিস রিক্সোওলাটা এখানে নিয়ে এসেছিল ।
অভয়ের কথায় চওড়া হাসি উপহার দেয় দালালটা ।
--হওয়ার কথাও নয় । তা, আমাদেরটা পছন্দ হয়েছে তো স্যার ?
সায় জানাতে গিয়েও থমকে যায় অভয় । জীবনে প্রথম এতবড় হোটেলে উঠেছে । প্রথম দর্শনে তো ঘাবড়েই গিয়েছিল অভয় । পাছে রিক্সোওলার চোখে হেয় হতে হয় তাই বাধ্য হয়েই ভেতরে ঢুকতে হয়েছিল । ম্যানেজারের ব্যবহারও এতটাই অমায়িক ছিল যে ফিরে যাওয়া যায়নি । রেট জানতে চাওয়ায় বলেছিল,‘ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না । আগে দেখুন আমাদের হোটেল ভালো লাগে কিনা, তারপর সে একটা বন্দোবস্ত হয়ে যাবে ।’
সব হোটেলেই একটা ডিসকাউন্টের ব্যাপার থাকে । জায়গাটা সমুদ্র থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় হয়ত তেমন টুরিস্ট পায়নি, তাই হয়ত ভরা মরসুমেও বন্দোবস্তের কথা বলছে ।
কিন্তু বন্দোবস্তের আগে তো মূল চার্জটা জানা উচিৎ ।
কিছুতেই জানালেন না ভদ্রলোক । খাতায় শুধু সই করিয়েই জোর করে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন ।
--যান, ঘরে গিয়ে রেস্ট করুন খানিকক্ষণ । সারা রাত জার্নি করে এসেছেন । পরে সব কথা হবে ।
এখন কি তবে দালালটাকে পাঠিয়ে দিয়েছে সন্তুষ্টির কথা জানতে ? তারপর নির্ঘাত গলা কাটা চার্জ হাঁকবে । সুতরাং অভয়ও ঘাঘু বোর্ডারের মতো জবাব দিলো ,‘তা আছে এক রকম । একটা তো মোটে দিন, চালিয়ে নেব ।’
দালালটা আদৌ অভয়ের কৌশলকে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,‘ম্যাডামকে দেখছি না স্যার !’
উটকো লোকের এহেন কৌতুহলে বিরক্ত হলেও সামলে নিল অভয় ।
--স্নানে গিয়েছে । কেন ?
--স্নানে! সমুদ্রে বেড়াতে এসে কেউ হোটেলের ঘরে স্নান করে নাকি ? বীচে যাবেন, ঢেউয়ের সঙ্গে খেলাখেলি করবেন, তবে না সমুদ্রের মজাটা টের পাবেন !
নাঃ, লোকটা বড্ড বাড়াবাড়ি করছে । এরপর কি গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়াতে হবে নাকি দালালটাকে ?
--সমুদ্রে দাপাদাপি করার বয়স আছে নাকি !
অভয়ের নিরাসক্ত জবাবেও হাল ছাড়েনা দালাল ।
--ব্যাটাছেলের আবার দাপাদাপি করতে বয়স লাগে নাকি ! বীচে গেলেই দেখতে পাবেন কত বুড়ো লোক হাফ প্যান্ট পরে ছেলেমানুষী করছে । তাছাড়া আপনার বয়স না থাকলেও ম্যাডামের তো আছে । ওনাকে স্নান করিয়ে নিয়ে আসুন ।
খোঁচাটা নিঁখুত এবং তীক্ষ্ণ হওয়া সত্বেও মেজাজ হারায় না অভয় ।
--ম্যাডামও ওসব পছন্দ করেন না । তাছাড়া আমরা বড্ড টায়ার্ড । খেয়েদেয়ে এখন জম্পেশ ঘুম লাগাবো । সন্ধ্যেয় যাব বীচে, ঘুরতে ।
ওফ, ঘাঘু লোক বটে ! এতক্ষণ সমুদ্র স্নানের পক্ষে ওকালতি করলেও নিমেষে কথা ঘুরিয়ে নেয় ।
--সেটাই ভালো হবে । তা, সন্ধ্যেবেলায় শিবুয়াকে বলে দিয়েছেন তো আসতে ? অহেতুক হেঁটে ক্লান্ত হবেন কেন !
অবাক হয়ে যায় অভয় ।
--শিবুয়াটা কে !
--যে রিক্সোওলা আপনাদের নিয়ে এলো এখানে ।
--আপনি চেনেন ওকে !
অভয়ের বিস্ময়টাকে উপভোগ করে দালালটা ।
--সবাই সবাইকে না চিনলে চলে স্যার ? সবাই মিলে ভাগাভাগি করে না খেলে বাঁচবো কিভাবে !
কথাটা অবশ্য মিথ্যে নয় । সব টুরিস্ট স্পটেই এরকম ব্যবস্থা চালু আছে । তাবলে কাঁহাতক এই লোকটার সঙ্গে ফালতু কথা বলা যায় ! সুতরাং ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে খানিকটা অভদ্র হোতেই হয় অভয়কে ।
--আচ্ছা, এখন তবে আসুন । বড্ড টায়ার্ড । পরে কথা হবে ।
এহেন সরাসরি বক্তব্যে দালালটা হাঁ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে অভয়ের দিকে । তারপর চলে যেতে যেতে বলে,‘একবার ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে দেখা করে নেবেন । খুব জরুরী প্রয়োজন ।’
দরজা বন্ধ করে বিছানর ওপর ধপাস করে বসে পড়ে অভয় । জরুরী প্রয়োজনটা কী ধরণের হোতে পারে ! আইডেন্টিটি কার্ড দেখতে চাইবে নাকি ? এবার কী হবে ! কেন বেমক্কা মিথ্যে নামটা লিখতে গেল ? অবশ্য দোষটা পুরোপুরি অভয়ের নয় । পকেট থেকে তো কার্ডটা বের করতেই যাচ্ছিল, রিসেপশনের ভদ্রলোক দেখতেই চাইল না । ঠেলে রুমে পাঠিয়ে দিল । তাবলে অভয়ই বা কল্যাণ সেনগুপ্ত নামে সই করতে গেল কেন ? কেন দিতে গেল ভুল ঠিকানা ? এত ভয় কিসের ! এখন কি বলবে, ভুলবশতঃ কার্ডটা আনা হয়নি ? নাকি নিজের নাম ঠিকানাটা ভুলে গিয়েছিল ? তারপর কী বলবে লোকটা ?
ইতিকর্তব্য স্থির করতে না পেরে বিছানায় শরীর মেলে দেয় অভয় । বুক পকেট থেকে মোবাইলটা গড়িয়ে পড়ে । কাল সন্ধ্যে থেকে বন্ধ আছে যন্ত্রটা । বীথি নিশ্চয়ই যোগাযোগের চেষ্টা করেছে । বারংবার সুইচ অফের বিজ্ঞপ্তি শুনে নির্ঘাত চটে আছে । একবার সুযোগ পেলে অভয়ের পিন্ডি চটকে দেবে । যদিও কাল রাতে,বাসে, আধো ঘুমে ডুবতে ডুবতে ভাসতে ভাসতে সম্ভাব্য প্রশ্ন এবং তদুপযুক্ত উত্তরমালা ঠিকঠাকই সাজিয়ে রাখা হয়েছে তবু কে বলতে পারে সিলেবাসের বাইরে কোনও প্রশ্ন থাকবে না ? থাকে থাকুক । তবু তো বীথির জেরার জবাব দিতে দিতে বর্তমানের টেনশন থেকে খানিকক্ষণ রেহাই পাবে অভয় । তাছাড়া বলা যায় না, লাগাতার মিথ্যে জবাব দিতে দিতে একটা পথ বেরিয়ে আসতেও পারে, যে পথ ধরে এগিয়ে গিয়ে অভয় মুখোমুখি হতে পারবে ম্যানেজারের ।
একবার রিঙ হওয়া মাত্র ফোনটা ধরে বীথি । অভয় জিজ্ঞেস করে, ফোন করেছিলে ?
--না তো ! কেন ?
নিশ্চিন্ত হোতে গিয়েও হোতে পারে না অভয় । বীথি আচমকা এত লক্ষ্মী বউ হয়ে গেলে তো মুসকিল ।
--না,আসলে চার্জ না থাকায় মোবাইলটা অফ হয়ে গিয়েছিল তো, তাই ভাবলাম হয়ত ফোন করে না পেয়ে চিন্তা করছ ।
ইচ্ছে করেই কন্ঠস্বরে অভিযোগ ফুটিয়ে তোলে অভয় কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে আসে অন্য রকম জবাব ।
--হচ্ছিলই তো । কী করব, তুমিই তো ফোন করতে না করেছিলে ! সেমিনারের ভেতর ফোন বাজলে সবাই নাকি বিরক্ত হবে ।
কথাগুলো বলে চুপ করে যায় বীথি । অভয় বুঝতে পারে ফোনের ওপার থেকেই এপারের পরিস্থিতিটা বুঝে নেয়ার চেষ্টা চলছে । কোন রকম সন্দেহজনক শব্দ পেলেই মেশিনগান চালাতে শুরু করবে । ঈস, এসময় যদি বাথরুম থেকে বেরিয়ে কিছু বলে বসে কণা ? সেধে আরেকটা বিপদ ডেকে নিয়ে এলো অভয় !
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকেই আমুদে গলায় বলে বীথি,‘জানো, কাল রাতে একটা কান্ড করেছে তোমার মেয়ে । উল্টোদিকে মুখ করে শুয়েছিল । কথা বললে উত্তর দিচ্ছিল না । আমার সন্দেহ হলো । লাইট জ্বালিয়ে দেখি মেয়ের চোখে জল । যত জিজ্ঞেস করি, কাঁদছিস কেন, মেয়ে তত কাঁদে । কিচ্ছু বলল না !’
মজা করে অভয়ও কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু স্বর ফোটে না । ওপাশ থেকে হাসে বীথি,‘কী হলো, তুমিও কাঁদতে শুরু করলে নাকি ! ছিঁচকাঁদুনে বাপ বেটি নিয়ে আমার হয়েছে জ্বালা । আরে বাবা,অফিসের কাজ থাকলে তো যেতেই হবে । এত ইমোশনাল হওয়ার কী আছে !’
জোর করে হেসে গলা সাফ করে অভয় ।
--কী করছ বীথি ?
--স্নান করে উঠে সিঁদুর পরছি ।
অভয়ের চোখের সামনে বীথির সিঁদুর পরার ছবিটা ফুটে ওঠে । ছোট্ট টিপ দেয় অথচ নাকের ওপর একরাশ সিঁদুর পড়ে থাকে । গুঁড়োগুলো পরিস্কার করে না বীথি । ওগুলো নাকি স্বামী সোহাগের লক্ষণ !
বাথরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দে অভয় তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,‘ এখন রাখছি । পরে কথা হবে।’
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে কণা ।
--কী, স্নানে যাবে না ?
কণার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় অভয় । পরণে চওড়া পাড়ের লাল তাঁতের শাড়ি । হাতে শাঁখা । সিঁথিতে ডগডগে সিঁদুর । কপালে মস্ত টিপ । নাকের ডগা সিঁদুরের গুঁড়োয় মাখামাখি হয়ে আছে ।
অভয়কে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পায় কণা ।
--খারাপ দেখাচ্ছে ?
চাকরি পাবার পর সাদা শাড়ি, বিনা প্রসাধনেই অফিসে আসত কণা । পরবর্তিতে অভয়ের অনুরোধে কপালে ছোট্ট টিপ, রঙিন শাড়ি, হাল্কা লিপস্টিক পর্ব শুরু হলেও এই বেশে তো কখনও দেখা হয়নি । খারাপ তো লাগছেই না বরং পবিত্র একটা ভাব ফুটে উঠেছে ।
লাফিয়ে উঠে অভয়কে জামা পরতে দেখে অবাক হয়ে যায় কণা ।
--কোথায় যাচ্ছ ! স্নান করবে না ?
--ম্যানেজার ডেকেছে এখনই আসছি ।
কণাকে কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অভয় ।
(তিন)
-- আপনি ডেকেছেন !
--আমি ! কে বললো ?
ম্যানেজারের বিস্ময়ে মাথায় আগুন চেপে যায় অভয়ের ।
--আর বলবেন না মশায়, এখানে নামা ইস্তক আপনাদের দালালটা জ্বালিয়ে চলেছে । গিয়ে বললো, আপনি নাকি ডেকেছেন ।
দুচোখে হাসি মাখিয়ে অভয়ের উত্তেজনাটাকে উপভোগ করে ম্যানেজার । প্রশ্রয়ের স্বরে বলে,‘দেবুটা ওরকমই ! ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে । আরে বাবা, অত তাড়াহুড়োর কি ছিল ? পালিয়ে তো যাচ্ছেন না ! খাওয়া দাওয়ার পরই কথা বলা যেত !’
অভয় বুঝতে পারে, দেবু বানিয়ে বলেনি । ধরে আনার হুকুম পেয়েছিল তবে ! ফিরে এসে যথাস্থানে রিপোর্টও করেছে ।
এবার ভয় পায় না অভয় বরং অদ্ভুত এক মরিয়াপণা মাথায় চেপে বসে ।
--এসে যখন পড়েছি তখন বলুন, ডেকেছেন কেন ?
অভয়ের আচরণটা নজর এড়ায় না ম্যানেজারের । রিসেপশন রুমে পাতা সোফায় নিজে বসে পাশে হাত থাবড়ে বলে,‘ বসুন । দাঁড়িয়ে কথা বলা যায় !’
বসবে না স্থির করেও বসে অভয় । তবে পাশে নয়, উল্টো দিকের সোফায় । সোজা তাকিয়ে থাকে ম্যানেজারের চোখের দিকে ।
--ক'দিন থাকবেন ?
--শুধু আজ । কাল সকালেই চেক-আউট করবো ।
চোখ না সরিয়ে কথাগুলো বলে অভয় । ম্যানেজারও চোখ সরায় না ।
--আসলে একটা কথা তখন বলা হয়নি । একটা অফার আছে । আপনাদের আজকের লাঞ্চ, ডিনার পুরো ফ্রি । এমন কী কালকের ব্রেকফাস্টও ।
--আর রুম রেন্ট ?
--সেটাও নমিন্যাল । জাস্ট টোকেন একটা অ্যামাউন্ট ।
উত্তেজনায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় অভয় ।
--মানে! আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো, আপনাদের এটা হোটেল, নাকি কোন ধর্মশালা ?
অভয়ের উত্তেজনাকে যথারীতি পাত্তা না দিয়ে হো হো করে হেসে ওঠে ম্যানেজার ।
--ওফ, পারেনও বটে রসিকতা করতে ! বসুন, বসুন ।
বসেনা অভয় । দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে ওঠে,‘ আপনার চ্যারিটি আপনার কাছেই রাখুন । আমি ফ্রিতে জুতোর কালি খাই না ।’
এবার ম্যানেজারও উঠে দাঁড়ায় ।
--আরে মশায়, ফ্রিতে কেন হবে ? আপনাকেও একটা কাজ করে দিতে হবে । যাকে বলে গিভ অ্যান্ড টেক ।
--কী কাজ ?
--একটা ছোট্ট জিনিস দেব, সেটা ঘরে নিয়ে গিয়ে রাখতে হবে ।
--কী জিনিস ?
এতক্ষণে অভয়ের চোখের ওপর থেকে চোখ সরায় ম্যানেজার । দেয়ালে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলে,‘ছোট্ট একটা ক্যামেরা । বেডের পাশে যে ওয়ারড্রোবটা আছে তার ভেতরে দেখবেন জায়গা করাই আছে । ওখানে রেখে দেবেন । আর হ্যাঁ, লাইট কিন্তু নেভাবেন না । যদিও যন্ত্রটা দামী, অন্ধকারেও ছবি ওঠে, তবু আমি কোন রিস্ক নিতে চাই না ।’
আচমকা মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে ওঠে অভয়ের । চারদিক শূন্য ঠেকে । নিজেকে সামলাতে ধপ করে সোফায় বসে পড়ে ।
--কিসের ছবি ?
খিকখিক করে হাসে ম্যানেজার ।
--নাঃ, আপনি বড্ড সাধাসিধে । কিসের আবার, আপনাদের ভালোবাসাবাসির! আপনি শুধু ক্যামেরাটা অন করে দেবেন, ব্যস, অফও করতে হবে না । যা ব্যাটারি ব্যাক আপ আছে তাতে দুপুর থেকে রাত অবধি দিব্যি চলে যাবে ।
এরপর আর উত্তেজিত হয় না অভয় । হাততালি দিয়ে বলে ওঠে,‘ দারুন অফার । রাজী আছি । তবে তার আগে লোকাল থানা থেকে পারমিশান নিয়ে আসি ?’
ম্যানেজারও হাসে ।
--অবশ্যই যাবেন । তবে ওখানে কিন্তু আইডেন্টি কার্ড দেখাতে হবে । প্রমাণ দিতে হবে, যাকে নিয়ে এসেছেন তিনি আপনার আসল স্ত্রী । আমাদের চোখকেই যখন ফাঁকি দিতে পারেননি তখন পুলিশের ঘাঘু চোখকে পারবেন তো ?
খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নেয় অভয় ।
--দারুণ চোখ তো মশাই আপনার ! ডিটেকটিভ ফিল্ম দেখেন বুঝি ? তা টিকটিকিবাবু, যদি ধরেও নেই যে উনি আমার স্ত্রী নন, বান্ধবী, তাতে কী এসে যায় ! সেটা তো ক্রিমিন্যাল অফেন্স নয় । আমরা দুজনেই সাবালক । স্বেচ্ছায় এসেছি । সুপ্রীম কোর্টের রায়টা জানা আছে তো ? এরপর কি করতে পারে আপনার থানা ?
মন দিয়ে অভয়ের কথাগুলো শোনে ম্যানেজার তারপর হাসি মুখেই জবাব দেয়,‘আমি জানতাম এসবই বলবেন । আপনাকে দেখেই বোঝা যায় এসব ব্যাপারে কোন প্র্যাক্টিকাল অভিজ্ঞতা নেই । টি.ভিতে, খবরের কাগজে কিছু বুকনি পড়ে চলে এসেছেন । আরে বাবা, দেশটা এখনও বিলেত হয়ে যায়নি । সুপ্রীম কোর্ট কী বলল তাদিয়ে আমাদের দেশ চলেনা । পুলিশই শেষ কথা । একবার ফাঁদে পড়লেই বুঝে যাবেন কত ধানে কত চাল । মিডিয়া ডেকে আপনাকে দেবে ফাঁসিয়ে, তারপর ছুটুন না সুপ্রীম কোর্টের দরজায়, মান সম্মান ফেরত পাবেন ?’
কথাগুলো মন দিয়ে শোনে অভয় তারপর এগিয়ে গিয়ে ম্যানেজারের কাঁধে হাত রাখে ।
--ঠিকই ধরেছেন । সত্যিই আমার কোন এক্সপেরিয়েন্স নেই । যাক, সুযোগ যখন পেয়েছি তখন না হয় ধান আর চালের মাপটা জেনে আসি । ডাকুন আপনার পুলিশ,তারপর দেখি কে বিপদে পড়ে !’
এতক্ষণে ম্যানেজারের স্বরে বিব্রত ভাব ফুটে ওঠে ।
--অহেতুক ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছেন ! মানছি, আমাদের হয়ত কিছু টাকা খসবে কিন্তু আপনার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে, বলে দিলাম ।
রুমের দিকে যেতে যেতে অভয় বলে যায়,‘ থ্যাংকস ফর ইয়োর অ্যাডভাইস । আপাততঃ বিলটা রেডি করুন, আমরা চেক আউট করব ।’
(চার)
এবারের বাসটা খুব কেতাদুরস্ত । পুরো শীততাপ নিয়ন্ত্রিত তো বটেই এমন কী টিভিও রয়েছে । বাস চালু হওয়া মাত্র টিভিতে সিনেমা দেখানো শুরু হলো । কিন্তু দেখবেটা কে ? পরপর দু রাতের ক্লান্তি সহ্য করতে পারেনি কণা । সীটটাকে হেলিয়ে আরামে ঘুমিয়ে পড়েছে । অভয়ও তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে । যদিও' সেটা নিছকই অভ্যেসবশত কারণ জানলায় সাঁটা কালো কাচ আর ওপারের অন্ধকার ষড় করে কোন দৃশ্যকেই প্রবেশাধিকারই দিচ্ছে না । না দিক । আগ্রহও নেই অভয়ের । বরং শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবা প্রয়োজন এবং কি নিয়ে ভাববে সেটা ভাবতেই ভালো লাগছে ।
আচমকা সোজা হয়ে উঠে বসে কণা । অবাক হয় অভয়,‘কী হলো !’
চারপাশে তাকায় কণা তারপর অভয়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে,‘সিঁদুরের কৌটোটা হোটেলের বাথরুমে ফেলে এসেছি ।’
উত্তরে হো হো করে হেসে ওঠে অভয় । আচমকা তাল কেটে যাওয়ায় সহযাত্রীরা বিরক্ত চোখে তাকায় বটে কিন্তু কে কার পরোয়া করে !

0 মন্তব্য
প্রদর্শন
আড়াল