গল্প
বিপ্লব আসছে
বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
দিনটা পরমার জন্য জায়গা বদল করল ।
রাতটা ভারী পাথরের মত চেপেছিল । বুকের মধ্যে যেন কেউ শিলনোড়া দিয়ে মশলা পিষছে । গতকাল ছোটছেলের ঘরটা সাফসুতরো করতে নেবেছিল পরমা । বহুদিন হাত না পড়ায় সব কিছুতে পাতলা সরের মত ধুলো । সেটা ঠিক করতে গিয়ে সব পুরোন খাতাপত্র, ওর যত বই আবার একটু নেড়ে ঘেঁটে দেখছিল, স্পর্শ খুজছিল চামড়া কুঁচকানো আঙ্গুলগুলো । কিন্তু ওই ঘরে অত সময় কাটান উচিত হয়নি । রাতভর বুকে কষ্ট জমল । ঘুম হয়নি । জালিকাটা আলো ঘর না ছুঁতেই উঠে পড়েছিল পরমা । টানা বারান্দা ধরে এগিয়ে গ্রিলের দরজাটার তালা খুলতে গিয়ে চোখে পড়ল কাগজটা । মলিন । একটা চিরকুটের মত কিংবা আর একটু বড় বুঝি । তাতে লাল কালিতে মোটা করে লেখা ‘বিপ্লব আসবে ।’
বিপ্লব যখন যেমন এখানে ওখানে পালিয়ে বেড়াত, সেসব দিনে তার আসার খবর এমনিভাবে এসে পৌঁছেছে বরাবর । দেখেই বুকটা দ্রিমি দ্রিমি করে উঠল । আসছে বিপ্লব ? তার ছেলে, ছোট ছেলে । এত বছর বাদে ? তাহলে মায়ের প্রাণ ঠিক বলেছে এতদিন, সে বেঁচে আছে। লুকিয়ে আছে, সময় হলে বেরিয়ে আসবে ।
এত বছর বাদে আজ বিপ্লব আসছে ।
ঠিক সেই সময়ে আকাশের খোসা ছাড়িয়ে সূর্য মাথা বাড়াল আর দিকদিগন্ত পেয়ারাফুলি আমের মত লাল হলুদে ছেয়ে গেল । বুকের কষ্টও ভুলে গেল পরমা । এতদিন বাদে বিপ্লব আসছে, কি খাওয়াবে আর কি খাওয়াবে না ছেলেকে এই ভাবনায় ডগমগ করে উঠল মন । একটু বাজারে যাওয়া দরকার, কিন্তু কাজের বউটা না এলে বেরোতে পারবে না । সে বেটি দরজায় তালা দেখলে এক মুহূর্ত দাঁড়াবে না, উল্টো পথ ধরবে । যতক্ষণ মিনতি এলো না, পরমা ঘরবার করল আর থেকে থেকে কাগজটা নিয়ে নাড়াচাড়া । হাতের লেখা বিপ্লবেরই, কোন সন্দেহ নেই । দলের কাউকে দিয়ে পাঠিয়েছে । ওদের দল আছে তাহলে এখনো । অনেকদিন ওরা খবরে নেই, কাছাকাছি যে দুই একজনকে চিনতো পরমা, তাদের চুলে পাক ধরেছে । হয়তো বিপ্লবকে ভুলেই গেছে ওরা । তাদের কাছে বিপ্লবের কোন খবর থাকে না আর । নতুন ছেলেপিলে জুটেছে হয়তো, তাদেরই কেউ রেখে গেছে ।
আচ্ছা বিপ্লবেরও কি এখন চুলে পাক ? কি ঝাঁকড়া চুল ছিল ছেলেটার, তেমনি কোঁকড়া । কলেজ থাকতে সেই চুল ঘাড় অবধি নেবে এসেছিল, মাঝে মধ্যে ফেট্টি বাঁধত । তারপর একদিন সেই চুল হয়ে গেল কদমছাঁট । কেন রে ? বেশ ভালই তো লাগছিল । এমন খোট্টামার্কা চুল বানালি কেন ? হেসেছিল ছেলে, বিপ্লবকে সহজে চেনা গেলে চলবে না মা আর ।
শুনে বুক কেঁপে উঠত পরমার । কি করেছিস তুই ? কেন না চেনা দিয়ে থাকতে হবে ?
কিছু করার দরকার হয় না মা, কিছু যদি করে বসি সেটা ভেবেও তো লোকে ভয় পেতে পারে । অমন রকস্টার মার্কা চুল থাকলে মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়া যায় না ।
হয়তো এখন চুলই বাকি নেই কোন আর । সে না থাকুক, রোগা হয়ে আসুক, ফর্সা চেহারা কালসিটে মেরেও যদি আসে, কোন ক্ষতি নেই পরমার । শুধু বিপ্লব আসা চাই । তারপর তাকে তরতাজা করে তোলা মায়ের হাতে ।
মিনতিকে বলেই ফেলল । বাজার যাবে শুনে সে মেয়ে বলে কিনা ফিরিজে তো এতো খাবার পড়ে আছে । একলা মানুষে আর কি লাগবে তুমার ? দাদা আসবে ?
হ্যাঁরে, ভাল কিছু ঘরে নেই ।
বদ্দাদা তো খায় এত টুকুনি, তার তরে যথেষ্ট আছে দেখো গে ।
মিনতি রান্নাও করে দেয় । নতুন করে বাজার করে আনতে আনতে তার দেরী হয়ে যাবে । সে মেয়ে সেয়ানা ।
না রে ছোদ্দাদা ।
ছোদ্দা ? নিমেষে মিনতির মুখে রং খেলে যায় । সে মায়ের হাত ধরে বিকেলের বাসন মাজতে আসত । আর ছোদ্দা বারান্দায় ঘুরে ঘুরে কবিতা করত । মিনতি বাসনে ছাই ঘষা ভুলে শুনত ।
বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদানত জনতার
ব্যগ্র গাত্রোত্থানে,
দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিতে
অগ্ন্যুতপাত হানে ।
দিকে দিকে কোনে কোনে লেনিনের
পদদ্ধনি
আজো
যায় শোনা,
দলিত হাজার কন্ঠে বিপ্লবের আজো
সম্বর্ধনা ।
তুমি নিজের নামে কবিতা লিকেচো ছোদ্দা ? কিশোরী মেয়ে বকের মত গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করত ।
শুনলি বুঝি ? আমার নামটাই যে অমনি । হেসে আবার শুরু করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিল বিপ্লব । এই মিনতি, তুই শিখবি কবিতাটা ।
তোমার নামের কবিতাটা ?
লেনিনের নামে । শিখবি কি না বল ।
বিপ্লব শিখিয়েছিল মিনতিকে । তারপর একদিন ওদের একটা মিছিল হবে, সেখানে সবার আগে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলেছিল, ধর এবার, বেশ জোর গলায় বলতে বলতে চল দেখি ।
সেই ছোড়দা কবে চলে গেছে, কবিতাটা ভোলে নি মিনতি । দুই সোমত্ত মেয়ের মা মিনতি মনে মনে কিশোরী হয়ে গেল হঠাৎ, ডানা ঝাপ্টে একটা খাঁচার পাখি খোলা আকাশের ডাক শুনলে যেমন হয় ।
পরমার সঙ্গে ব্যাগ ঝুলিয়ে মিনতিও বাজারে চলল ।
কেন রে ? তুই কাজগুলো এগিয়ে রাখতে পারতিস ততক্ষণে ।
সে এসে করবো একন ।
ঘোষবাড়িতে যেতে দেরী হয়ে যাবে না ? দেখিস বাপু, আমি ছোট মাছ কিনব, কেটে কুটে আঁশ ছাড়িয়ে দিতে হবে । তখন যেন বলিস নি, দেরী হয়ে যাচ্ছে ।
আজ ঘোষবাড়িতে যাবুই নি । সে আমার ভাবা হয়ে গ্যাচে । মিনতিরর ভাবটা হঠাৎ কোন অজানা কারণে স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার আনন্দে পায়ে ছন্দ তোলা শিশুর মত এখন ।
বদ্দাকে বলবে না মাইমা ?
হ্যাঁ হ্যাঁ স্বদেশকে তো বলতেই হবে । বিপ্লব আসবে, স্বদেশ জানবে না তা কি করে হয় । তার তো ছোট ভাই । এলে কতক্ষণ থাকবে সেটাও তো জানা নেই ।
স্বদেশ জানার আগেই পুরো বাজারের লোক জেনে গেল । মিনতির সর্দারি । বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে শাড়িটা গাছকোমর বেঁধে উবু হয়ে বসল মাছের ঝুরির সামনে । আর কটর কটর ।
দেখো পালানদা, মাচটা আজকের দিনে ঠকিওনি । ভাল মাচের তলায় গুঁজে দিলে দুটো পচা, এমনটি না হয় ।
মেয়ের বে দিয়েচো ? জামাই আসচে নিকি ? পালানের দোক্তাখাওয়া দাঁতে আলো অন্ধকারে হাসি ঝিলিক দিল ।
ও মা আমার কতটুকুন কতটুকুন মে, তাদের বে দিতে যাবো কোন আক্কেলে ? আজ বলে ছোদ্দা আসবে ।
কে ? দাড়িপাল্লা হাতে নিয়ে পালান থমকে গেল । বিপ্লব ? বিপ্লব আসচে ?
বিপ্লব কি চায় সবাই খবরটা জানুক ? পরমা আতান্তরে পড়ে গেল । মিনতিটা না – কিন্তু বলেই দিয়েছে যখন আর পরমার বুকটা খুশিতে ফুটন্ত দুধের মত টগবগাচ্ছিল এমনিতেই – মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, হ্যাঁ রে পালান । বিপ্লব আসছে আজ ।
বাড়িতে ?
তাই না রান্না করছি ।
পালান গলা তুলে হাঁক দেয়, ও সাদিকদা, শুনেছো বিপ্লব আসচে আজ ।
তিন দোকান পেরিয়ে সবজি নিয়ে বসেছিল সাদিক । মুখে রোদ পড়েছে, লুঙ্গির খুঁটে ঘাম মুছছিল । থমকে গেল । অস্ফূটে বলল, বিপ্লব আসচে ? তারপর তার সবজির ভান্ডার থেকে দুই আঁটি কচি পালক তুলে নিয়ে সটান হাজির । এইটা ধরেন মাসিমা, বিপ্লবের জন্যি ।
ক টাকা আঁটি ?
বিপ্লবের জন্য দিচ্চি মাসিমা, আমার তরফ থেকে । আসচে কখন ? একবার চলে আসতাম সময় ধরে ।
পরমাকে আর ঘুরে ঘুরে বাজার করতে হল না, পুরো বাজার তার কাছে এসে হাজির হল । টাটকা খলসে, কাতলা মাছের পেটি, কচি পাঁঠার ঠ্যাং, চন্দ্রমুখী আলু, নতুন পটল, হিমসাগর আম বিপ্লবের কারণে পরমার পায়ের কাছে ডাঁই । মিলন তার রিক্সা এনে সব কিছু টেনে টেন তুলল, কোন ফিকির নেই মাসিমা । আমি সব বাড়ি অবধি তুলে দিচ্ছি ।
যতক্ষণে বাড়ি অবধি এলো ওরা, সেখানে পাড়া প্রতিবেশীতে মৌমাছির চাক ।
কি গো পরমাদি, একটা রা কাড়ো নি আমাদের কাছে । শুনলাম বিপ্লব আসছে আজ ?
আমিই কি জানতাম নাকি আগের থেকে । অস্বস্তির হাসি হাসল পরমা ।
মাসিমা, বিপ্লব কখন আসবে তার জানেন কিছু ? হাতে ক্যাম্বিসের ফোলিও, প্যান্টে বুশ শার্ট গুঁজে প্রনবশঙ্কর নটা বত্রিশ ধরতে যাচ্ছিল । ভাগ্যিস অফিসে বেরোনোর পথে জেনে গেলাম, না হলে দেখা হত না হয়তো ।
সেকি প্রনবদা, অফিস যাবে না আজ ?
ধুত্তোর অফিসের নিকুচি করেছে, বিপ্লব আসছে আজ, অফিস কিসের ?
ঘোষ বাড়ির বউ ছিল ভিড়ের মধ্যে । সে মুখ বাড়িয়ে বলল, ও মিনতি, তুই এবেলা না এলেও চলবে । মাসিমার হাতে হাতে সব একটু এগিয়ে দে বরং ।
পরমা সবাইকে উঠোনে ডেকে চা বিস্কুট খাওয়াল । মিলন রিক্সার ভাড়া নেয়নি, ওকেও । বেশ খানিক গুনগুন গুজগুজ হল, সবার মুখে শুধু বিপ্লবের কথা । যাওয়ার আগে জনে জনে বলে গেল, এলে একবার খবর দিও দিদি, এমনিতেও বিকেলের দিকে একবার ঢুঁ দিয়ে যাবো । অনেকে আবার গেলই না । যেন উৎসব বাড়ি, এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকল ।
ভিতরে ভিতরে বিপ্লবের জন্য এতগুলো লোকের টান দেখে পরমার মনটা ভরে উঠছিল । এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে হাজির স্বদেশ । তার চেহারা এমনিতেই শুকিয়ে আমের আঁটির মত হয়ে গেছে আজকাল, মাথার চুলও যায় যায় । তার ওপরে আজ চোখে চিন্তার ছাপ ।
একি মা, সবাই জানে বিপ্লব আসছে । আর আমাকে জানাও নি ।
আমি কি আর জানিয়েছি কাউকে ? পুরোন পাড়া, যে কোন খবর পাড়া পড়শি শুঁটকি মাছের মত শুঁকে নেয় ।
উত্তরে খুশি হল না স্বদেশ, বিপ্লব এখনো আসেনি তাতেই মা কেমন অন্য সুরে তান ধরেছে যেন । কখন আসছে ? কেন আসছে জানো কিছু ?
ও মা, নিজের বাড়ি আসবে তার অত জানাজানির কি আছে ।
না মানে, এত বছর কোন খবর নেই। হঠাৎ ?
সে কথা স্বদেশ, ছেলে বাড়ী আসবে তার অত কারন ঘাঁটার কি আছে ?
ঢোঁক গিলল স্বদেশ । মা তার পুরো নাম ধরে এমন ডাকছে, ইঙ্গিতটা ভাল নয় । না না কারণ কিছু নেই । বাবা মারা গেল, একবার উঁকি দিয়েও দেখল না । আজ এতদিন বাদে কিনা – স্বদেশের মন বলছে সে যে বাড়িটা বেচে ফ্ল্যাট করার দিকে এগোচ্ছে সে খবর নির্ঘাত বিপ্লবের কানে পৌঁছে গেছে । মুখে যতই যা বলুক পয়সা কড়ি সম্পত্তির নামে লোকে কবর খুঁড়েও উঠে দাঁড়ায় ।
তোর আজ আপিস নেই ?
না, বিপ্লব আসছে । আজ কি করে যাই আর । সে বাবু থাকবে না চলে যাবে সেটাও তো জানা নেই । বানীও আসত, কিন্তু বাবানের স্কুল থেকে না ফেরা অবধি বাড়ি ছেড়ে বেরনোর উপায় নেই ।
আসলে বানীই তাকে ঠেলে পাঠিয়েছে । যদি বিপ্লবের সঙ্গে বাঁটোয়ারা করতে হয়, সে কথাটা বলে নেবার জন্য । মাকে কোনমতে রাজি করানো গেছে, একবার কাজ শুরু হয়ে গেলে মাঝখানে এসে বাগড়া দিলে মুশকিল । বানী মুখ গোমড়া করে বলল, এতদিন পাত্তা নেই, সবাই জানে মরে হেজে গেছে। ঠিক যেই খবর পেয়েছে তুমি প্রমোটারের সঙ্গে কথা বলছো, অমনি মূর্তিমান উদয় হয়েছেন । এরা মুখে যাই বলুক তলে তলে সবার এক ধান্দা । দেখো, আমি পৌঁছানোর আগেই যদি বাঁটোয়ারার কথা ওঠে, দক্ষিণ পূবটা যেন ছেড়ে দিও না । তুমি যা গোবরগণেশ ।
তার চুলহীন মাথার টিকিটা বানীর হাতে বাঁধা থাকে । ফলে স্বদেশের মনে খুব চাপ ।
বারীন বোসের জিপটা এমনি সময়ে ঘ্যাঁচ করে এসে দাঁড়াল । পরমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল । কুকুরের মত শুঁকে শুঁকে চলে এসেছে এই লোকটাও ।
আপনি ? হঠাৎ ?
না, না খবর পেলাম তো, একবার দেখতে এলাম আর কি । অম্লান বদনে বলল বারীন ।
বিপ্লব কি কিছু করেছে ? ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেছিল পরমার ।
না না করবে কি আর । ওদের মাজা ভেঙ্গে গেছে বহুদিন । তাছাড়া কোন চালু কেস তো নেই । দেখছেন না সাদা পোষাকে এসেছি । কোন পাইক বরকন্দাজও সঙ্গে নেই ।
তাহলে ?
হেঁ হেঁ করে এক দফা হেসে নিল বারীন । পরমার মনে হল ওর গোঁফের সঙ্গে যেন হাসিটা মানায় না । কোন কেস যাতে না হয় সেজন্যেই মুখটা দেখিয়ে যাওয়া । কেউ যদি ওকেই ঝপ করে ঠুকে দিয়ে যায়-
বালাই ষাট, ওর কি হবে বাবা, বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক । মলয়ের দিদা ছোটবেলা থেকে বিপ্লবকে মলয়ের সঙ্গে বড় হতে দেখেছে । খবর পেয়ে এসে বুড়ি সেই থেকে এসে তিন মাথা এক করে বসে আছে । দারোগার কথায় খন খন করে উঠল একেবারে ।
পরমাও বিড়বিড় করে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ । বিপ্লব দীর্ঘজীবি হবে ।
যে কজন তখনো উঠোনের আশেপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে ছিল, তারা সমস্বরে বলে উঠল , বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক ।
অ্যাই, এই সোরগোলটা যাতে না হয় সেজন্যেই আমার আসা । বিপ্লব আসুক । বসতে দিন, খেতে দিন, শুতে দিন । কেতরে পড়ে অনেক কাল বাঁচুক সে । পুলিশের কোন মাথাব্যাথা নেই । কিন্তু হল্লাবাজি হবে না কোন । সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে মেপে নেয় বারীন বোস । মনে থাকে যেন, বেঘোরে কেউ প্রাণটা খোয়াক সেটা আমাদেরও ভাল লাগে না ।
বারীন দারোগা যাওয়ার আগে বলে গেল, সে বিকেলেও আর একবার আসবে ।
সারাদিন রান্না করতে করতে একটা শঙ্কা বুকের মধ্যে তোলপাড় করছিল পরমার । মিনতি হাতে হাতে এগিয়ে দিচ্ছিল, স্বদেশ ঘরে বারান্দায় ঘুরে ঘুরে কিসব মাপজোক করছে, উঠোনে বেশ কিছু লোক গুনগুন করছে । কতজনে যে স্কুল কলেজ অফিস ছুটি দিয়ে আজ বিপ্লবের জন্য বসে আছে । কতকালের কথা যেন জমে আছে তাদের । শুনতে খুব ভাল লাগছিল পরমার । একটা চেয়ার টেনে নিম গাছের তলায় বসেছিল এসে তাই । মিনতি কটা মাদুর আর শতরঞ্চি বিছিয়ে দিয়ে গেছিল, উপস্থিত সবাই ওখানেই আসন পিঁড়ি হয়ে বসে । পালান ছেলেটা তো সেই সকালে এসেছে, ঠায় বসে আছে ।
কিছু খেয়েছো বাবা ?
হ্যাঁ মাসীমা । ছেলেটা এসে দুটো মাছভাত দে গেল, ওই সাপটেচি । বিপ্লব যে আমাদের কি ছিল মাসীমা, যখন ছিল পরানটা ডগমগাত, আমাদের মত ছোট মানুষদের আশা আকেঙখাগুলো তকন লাউডগার মত বাড়তে লেগেচিল ।
বিজন ছেলেটা বাচ্চা । মুখ বাড়িয়ে বলল, আমরা তো বিপ্লবকাকুকে দেখি নি কখনো বাপকাকার মুখে যা শোনা । ভাগচাষী থেকে নিজের জমি হল, সে নাকি কাকুর জন্যে ।
আমরা তো নিজের চোখে দেকেছি । লক আউট চলছে, আমরা ধর্নায় । পুলিশ খেদাতে এলে, তাদের চোখে চোখ ঠেরে কতা কইত । এমনিধারা লোক ছিল সে, জানদার । একন সে কারখানা উঠে ফেলাট হল, বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর একটা লোক নেই ।
এমন সময় আজকের তাজা খবরের সাংবাদিকেরা পরমার বাড়িতে এসে পৌছাল । একজনের হাতে ক্যামেরা আর অন্য মক্কেলের হাতে লাল ঝুঁটি মাইক । এতক্ষণ যারা ধর্না দেবার মত একঠায় বসেছিল, অনেকে ক্যামেরার সামনে মাছির মত ভনভন করে উঠল । কি ব্যাপার, টিভিতে দেখাবে নাকি ?
ক্যামেরা হাতে ছেলেটা দাঁত বের করে হাসল । শুধু দেখাবে, টিভি খুলে দেখুন বিপ্লব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে ।
চারদিকে রব উঠল টিভি, টিভি ।
বিপ্লবকে এতগুলো লোক ভালবাসে, তাদের কাছে সেসব শুনতে পরমার খুব শান্তি হচ্ছিল, যেন এতদিনের প্রানের জ্বালা জুড়োচ্ছিল তার । কিন্তু টিভির লোক আসতেই লোকের মন চলে গেল ওদিকে ।
মাসিমা, সবাই টিভি দেখতে চাইছে, আপনার বারান্দা থেকে টিভিটা বাইরের দিকে টেনে আনি ? মিলন ছেলেটা খুব করিতকর্মা । ঝপ করে আরও দুটো লোক নিয়ে একটা টেবিল পাতিয়ে তার উপরে টিভিটা বসিয়ে দিল । চালিয়ে দেওয়া হল আজকের তাজা খবরের চ্যানেল ।
পরমার এসব মোটেই ভাল লাগছে না । টিভি ফিভি এসব কেন ? কিন্তু দিনের মাঝখানের সময় থেকে আজকের দিনটার রাশ তার হাত থেকে বেরিয়ে গেছে, যা হবে সবাই ঠিক করে দিচ্ছে । তার যেন আর কিছু বলার নেই ।
টিভির স্ক্রিনে ঝলসে উঠল মাননীয় নেতা হরিকেষ্ট দাশগুপ্তর মুখ । কি চাইতে পারে বিপ্লব ? কেন ফিরে আসার চেষ্টা করছে? আমাকে যদি জিজ্ঞেষ করেন, আমি বলবো নতুন করে গল্প ফাঁদার জন্য ।
লিপস্টিক রঞ্জিত মুখে হাসি ছড়িয়ে শেলী বোস জিজ্ঞেস করল, গল্প, কিসের গল্প হরেকেষ্টদা ?
বিপ্লবের কাছে লোক ভুলানো গল্প ছাড়া আর আছে কি ? আমাদের গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা যা পরিবর্তন আনতে পেরেছি –
পাশে বসেছিল লাল পোলো শার্টে অম্লান ঘোষ, ভেঙ্গিয়ে উঠলেন । আপনাদের গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কি দিচ্ছেন, লোকে জানে । এখানে আর মুখ খুলাবেন না । আমি বলছি, হ্যাঁ একসময়ে বিপ্লবকে সঙ্গে নিয়ে আমিও ঘুরেছি গ্রামে গঞ্জে । আমি জানি বিপ্লবের কি উদ্দেশ্য । আপনাদের মত অসৎ নেতাদের –
মুখ সামলে কথা বলুন, এটা টিভি স্টুডিও না হলে -
নারদ নারদ খেলা হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই শেলী সেটা হাতের মুঠোয় আলটপকা তুলে নিল । আমরা আজকের রাজনীতিতে বিপ্লবের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে বিতর্কে এখন নিচ্ছি ছোট্ট একটা ব্রেক, আমি আপনাদের সদাহাস্যম্যী সঞ্চালিকা শেলী বোস ফিরে আসছি ঠিক সাড়ে তিন মিনিটে । আপনাদের গো স্ট্যাচু করে গেলাম । কোথাও যাবেন না । সঙ্গে থাকুন, মাথায় রাখুন ।
এরপর চারখানা বিজ্ঞাপন হল । রোমানো পিজা, মডার্ন ব্রা, সাক্সেস টিউটোরিয়াল আর লেটস গো ট্রাভেলজের সুন্দরী মডেলরা এসে গান গেয়ে, কোমর বাঁকিয়ে, ঠোঁট ফুলিয়ে বিভিন্ন আবদার এবং আবেদন রেখে গেল । এর মাঝে লাল ঝুঁটি মাইকের ফোন বেজে উঠল । ওপ্রান্তে শেলী বোস । কি হল, তিন রাজনৈতিক দলের নেতা এখানে বসে আছে । এর মধ্যে একজন আবার নিজেই এক সময় বিপ্লব টিপ্লবকে নিয়ে ঘুরেছেন । এদের সঙ্গে আর কত হ্যাজাবো ? কখন আসবে বিপ্লব ?
মাসীমা, আপনি জানেন কখন আসবেন বিপ্লববাবু ? ফোনটা হাতে চেপে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা ।
আসবে যখন সময় হবে । অত কি দিনক্ষণ মেপে আসবে ?
তা বললে কি করে হবে ? আপনি বলেছেন আসবে । টিভিতে এতগুলো মান্যগন্য লোক জড়ো হয়েছে, এখন বলছেন দিনক্ষণ জানেন না ?
ছেলেটা এমনভাবে বলছে যেন পরমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে । কেন রে বাপু, আমি তোদের টিভিতে প্রোগ্রাম রাখতে বলেছিলাম ? মুখে কিছু না বলে অন্যদিকে ফিরে বসল পরমা ।
মাইকবাহন ছেলেটা ক্যামেরাধারীর দিকে চেয়ে বলল, আজকের টিআরপিটা কেচে গন্ডুষ করে দিল মাইরি । এখন শেলীদিকে যে কি বলি !
বিপ্লব এখনো না আসার সমস্ত দায়িত্ব মাথায় নিয়ে লাল ঝুঁটি মাইকের মালিক ছেলেটি বলল, শেলীদি, এখানে অনেক লোক জমা হয়েছে । তার মানে আসছে পাক্কা । বিপ্লব যেই এন্ট্রি মারবে আমরা ওর উপরে জুম করবো । ততক্ষণ তুমি কচরমচর চালিয়ে যাও, আমি এখানে লোক ধরে ধরে বাইট নিচ্ছি ।
কুচো লোক ধরে বেশিক্ষণ খাওয়ানো যাবে না । বিপ্লবের মাকে ধরো । আমি গলায় ফাঁসি গানটা গেয়ে ধরতাই দিচ্ছি, সেখান থেকে বিপ্লবের মাতে জুম ইন করবো ।
ব্রেক শেষ হতেই শেলী বোসের গলায় গান – একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি । হাসি হাসি পড়বো ফাঁসি দেখবে স্বদেশবাসী – হ্যাঁ সেই বিদায় নিয়ে চলে যাওয়া বিপ্লব আবার ঘুরে আসছেন । আমাদের এখানে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে আমরা গত আধ ঘণ্টা বিপ্লবের কথা বলেছি । এবার চলে যাচ্ছি সেই মায়ের কাছে, আমাদের সেই মা যার কোলের ছেলে তাকে ফেলে, স্বদেশকে ফেলে চলে গেছিল অনেক দূরে । সবাই ভেবেছিল বিপ্লব হেরে গেছে, ব্যার্থ হওয়ার লাঞ্ছনায় মুখ লুকিয়েছে । কিন্তু না, বিপ্লব আজ আসছে । আসছে টিভিতে । আসছে আপনাদের প্রিয় অনুষ্ঠান শেলীর সঙ্গে ডেইলিতে । কিন্তু তার আগে আমরা খুঁজে নেবো বিপ্লবের মাকে শুধু আপনাদের জন্য । আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা পৌঁছে গেছে বিপ্লবের জন্মস্থলে, শুনুন বিপ্লবের মা পরমা দেবী কি বলছেন ।
লালঝুঁটি মাইক হাতে ছেলেটি পরমার কাছে এগিয়ে এলো, সঙ্গে ক্যামেরা হাতে তার সঙ্গী । চাপা গলায় বলল, মাসীমা আপনি এখন ক্যামেরায়, মুখটা এদিকে ঘোরান । তারপরেই চাঁছাছোলা সুরে, লালকাপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি আজকের তাজা খবরের অনন্য পাত্র । এখন কথা বলবো বিপ্লব মিত্রের মা পরমা দেবীর সঙ্গে । বলুন পরমাদেবী, এতদিন বাদে বিপ্লবের আসার খবর পেয়ে আপনার কেমন লাগছে ?
ক্যামেরার উপরের জোরালো আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল পরমার । কথা বলার ইচ্ছা না থাকলেও অস্ফূটে কোনমতে বলল, ভাল ।
মাইকটা যথাসম্ভব পরমার মুখের কাছে ধরল ছেলেটা । আপনার কি মনে হয় ? বিপ্লবের ফিরে আসার কি কারণ ? এতদিন আসতে চায়নি না আসতে পারেনি ?
সারাদিনের উত্তেজনায় ক্লান্ত পরমা জ্বলজ্বলে চোখে তাকায় । কি কারণ ? কেন এতদিন আসে নি ? সেও কি জানে তার কারণ ? বিপ্লব জানবে, আমি কি করে বলবো ? বিপ্লবের সময় হয়েছে, আসছে ।
আমরা আগে জানতাম, বিপ্লবের মৃত্যু হয়েছে, কাগজেও সেই নিয়ে অনেকবার কথা হয়েছে-
মলয়ের দিদা খেঁকিয়ে উঠল, বুড়ির কান আছে জোরালো । কে রে তুই ড্যাকরা ? মায়ের কাছে এসে বলছিস মৃত্যু হয়েছে ? কেন মরবে আমাদের বিপ্লব ?
চারপাশের লোক হইহই করে উঠল । বিপ্লব বেঁচে আছে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হবে ।
ছেলেটা যথাসম্ভব কথাবার্তাটা পরমার দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করল । আপনি কিভাবে জানলেন বিপ্লব আসছে ? কে জানাল আপনাকে ? সেটা আমাদের দর্শকদের জন্য একবার বলুন ।
সে ছেলে বরাবর ডাক পাঠায় । না বলে হঠাত এসে পড়েনি কখনো । আর বলেছে যখন এসেছে ।
এই কথায় ছেলেটা একটু ভরসা পেলো । না এসে পৌঁছালে তার এতবড় স্কুপটা মাঠে মারা যেতো ।
পরমা দেবীর কাছ থেকে আপনারা শুনলেন বিপ্লব কথা রাখে । তেত্রিশ বছর কাটিয়েও কেউ যদি কথা না রাখে, সে কথা রাখবে । সে আসবেই, শুধু একটু ধৈর্য রাখুন । আপনাদের স্টুডিওতে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে পরমা দেবীকে আমার শেষ প্রশ্ন, আজ বিপ্লব আসছে, বিপ্লব টিভিতে আসছে । এতে মা হিসাবে আপনার কি প্রতিক্রিয়া ? আলোটা চোখে সয়ে এসেছে । পরমাও হঠাৎ যেন গলার ধার খুঁজে পেলেন । জোর গলায় বললেন, কে বলল টিভিতে আসছে ? বিপ্লব আসছে না । বিপ্লব টিভিতে আসছে না ।
খুব ভেবরে গেল ছেলেটা, ভাবল ভুল শুনছে । কি বললেন, কে আসছে না । বিপ্লব আসবে না আজ ?
বিপ্লব আসবে । আসবেই । আজ কিংবা কাল, এতো লোক অপেক্ষায় আছে যে ওর জন্য । কিন্তু বিপ্লব টিভিতে আসছে না । বলতে বলতে গলায় চড়লো পরমার । না, বিপ্লব টিভিতে আসবে না । কখনোই আসেনি ।

0 মন্তব্য
প্রদর্শন
আড়াল