Published Date:10-10-2021
1633764968.jpg?v=1113754032

গল্প

শববাহী যান

রাজেশ কুমার

ক্লান্ত পায়ে কমলেশ্বর এসে দাঁড়াল কদমগাছটার ঠিক নীচে, ভিড়ের মাঝে । দুটো অসহায় চোখ মেলে ধরল চারপাশে । গ্রীষ্মের দিন । বিকেলের ছায়া মলিন হয়ে এসেছে । মিশে এসেছে মাটির সঙ্গে । তাহলেও আলো নিভে যেতে তখনও খানিক দেরি বলেই মনে হয় তার । কে জানে ! আজকাল কিছুই যেন ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারে না কমলেশ্বর । সবকিছু কেমন ঘোলা লাগে । মনে হয় চারপাশ ঘেরা এক ঘষা কাঁচের মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে আছে সে । বাইরের জগতের ঘটে চলা যা কিছু সব নদীর ঢেউয়ের মতো ছলাৎ ছল এসে পড়ছে সেই কাঁচের ওপর । ফিরে যাচ্ছে সেখান থেকে। তাকে যেন স্পর্শ করতে পারছে না কোন কিছুই । নিজেকে প্রাচীন বট অশ্বত্থের মতোই স্থবির মনে হয় কমলেশ্বরের । যতই হোক বয়সটা তো হল । তিন কুড়ি পার করে গেছে সেই কবে । যদিও লোকে বলে, আজকালকার যুগে এটা কোন বয়স নয় । যে কেউ পার করে দেয় হাসতে হাসতে, ছোটাছুটি করতে করতে । তবুও কমলেশ্বর জানে, তার বিষয়টা আলাদা । জন্মের পর পরই বাবা মাকে হারায় সে । খুব ছোট বয়স থেকেই তাকে যোগ দিতে হয়েছিল মুদিখানা দোকানে কর্মচারীর কাজে । এই কদমতলাতেই । মোড়ের মাথায় যেখানে সুপার মার্কেট রয়েছে ঠিক ওই জায়গায়, রামদার দোকানে । তখন এত বাজার দোকান শপিং মল ছিল না । সারা পাড়ার লোকের মুদিখানা সাপ্লাই যেত ওই রামদার দোকান থেকেই । হাড়ভাঙা খাটুনি । ঠিক মতো খাওয়াও জুটত না রোজ দিন । অযত্নে পরিশ্রমে শরীরটা তার ভেঙে গেছে বড় তাড়াতাড়ি । কমলেশ্বর ভাবে যে সময় চলে যায় সে কি আবার উলটো পথে হাঁটে ! না হলে চল্লিশ বছর পরে আবার এই কদমতলার মোড়েই তাকে এসে দাঁড়াতে হলো কেন ! কি জানি ভাগ্যের কি পরিহাস! জীবনের সব খেলা কী বুঝতে পারে তার মতো নগণ্য এক মানুষ ! ভিড়ের মধ্যে হালকা ঠেলা লাগে । নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা হঠাৎ থেমে যায় কমলেশ্বরের । সচেতন হয়ে ওঠে সে । 

যে কোন সময় এসে পড়বে ছেলের দল । রাস্তার দুধারে ইতস্তত জমা হতে শুরু করে দিয়েছে পাড়ার লোকজন । খবর এসেছে বনগাঁ থানা থেকে গাড়ি রওনা দিয়ে দিয়েছে অনেকক্ষণ । এতক্ষণে ভদ্রেশ্বর ঢুকব ঢুকব করছে । আজকাল মোবাইলেই সব খবরাখবর হয়ে যায় । আর সামান্যই পথ । কমলেশ্বর দাঁড়িয়ে থাকে বিকেলের শান্ত পরিশ্রান্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে । সূর্য নিভে গেলে আকাশটাও কেমন বোধশক্তিহীন হয়ে পড়ে । ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে আসে কত কথা । সতু পাল বলে, শুনলাম তো আত্মহত্যা । নিজেকেই গুলি করেছে নিজে । ঠোঁট উল্টায় ভীম বিশ্বাস ।

  • এনকাউন্টারও হতে পারে । পুলিশ অনেক দিন ধরেই তল্লাসি চালাচ্ছিল ।

মনোজ ভড় যোগ করে আরও একটা সম্ভাবনার কথা । অন্যকারও কাজও হতে পারে । শত্রুতা ছিল । ঠুকে দিয়েছে । ইলেকসানের সময় । জানে হাঙ্গাম হলে বিষয়টা অন্যদিকে ঘুরে যাবে । কথাগুলো কানে যাচ্ছিল কমলেশ্বরের । কিন্তু অভিঘাত তৈরি করছিল না কিছু । এসবই জানা কথা । মান্তু দিনের পর দিন এলাকা কাঁপিয়েছে বুলেট নিয়ে ।  খোলা রাস্তায় চেম্বার হাতে চমকে বেরিয়েছে নিজেরই শহরের মানুষজনকে । ইদানিং ফেরার ছিল । পান্ডুয়ার জোড়া খুনের মামলায় ফেঁসে গিয়ে জেলও হয়েছিল বেশ কিছুদিন । একদমই সাদামাটা এক ক্রাইম থ্রিলার । এভাবেই যে শেষ হবে বুঝতে অসুবিধা ছিল না কারও । তবুও এই বিচার বিশ্লেষণ ! কি হবে কমলেশ্বরের আর এসব নিয়ে ভেবে ! সময় থাকতে কিছুই করতে পারেনি সে । ঠিক এভাবেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থেকেছে অসহায় । নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে মান্তুর চোখ থেকে । পাছে চোখাচুখি হয়ে যায় । একটা অপরাধবোধ সব সময় কুরে খেয়েছে তাকে । রাতের বেলায় ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠতে চেয়েছে সে, মান্তু ফিরে আয় । ওপথে আর এগোসনি । ওপথে শুধু যাওয়া আছে ফেরা নেই । গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয়নি কমলেশ্বরের । শুধু একটা গোঁ গোঁ শব্দ । আর চোখে মুখে একরাশ উৎকন্ঠা ।  বুলেট চালাতে চালাতে থমকে দাঁড়িয়েছে মান্তু । চেন টানা ভারি বুট পরা পা মাটিতে ফেলে ভুরু কুঁচকে বিদ্রুপাত্মক তাকিয়েছে এক মুহূর্ত । তারপর খিল্লি ওড়ানো হাসি হেসে ‘ওয়ে ওয়ে’ গান গাইতে গাইতে লক্কা হয়ে চলে গেছে নিজের রাস্তায় । মিলিয়ে গেছে খোলা আকাশের নীচে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের মাঝে । স্বপ্নে সময় বোঝা যায় না । সেখানে সকাল, বিকেল, সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের তফাৎ থাকে না কোন । কেবল একটা মন কেমন করা আলো ছড়িয়ে থাকে সমস্ত ক্যানভাস জুড়ে । ঘুমভাঙা চোখে বিছানায় উঠে বসে কমলেশ্বর তাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার ঘরের পুরনো রঙচটা দেওয়ালের দিকে । হাত বাড়িয়ে ছুঁতে যায় মান্তুর চোখ মুখ কপাল চিবুক । পারে না । তার চারপাশে একটা ঘষা কাঁচের আস্তরণ অনুভব করে বারবার । 

ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে । বাবুরবাজার ছাড়িয়ে গেল । মানে আর পাঁচ সাত মিনিট । বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর এসে দাঁড়াল মান্তুর বউ ছেলে । শেষবারের জন্য মান্তুকে তারা নিয়ে যাবে তার নিজের বাড়ি । শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ করে দেবে একটু । কমলেশ্বর কি করবে ভেবে পায় না । মান্তুর বউ ছেলের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত সে । চল্লিশটা বছর সে শুধু থেকে গেছে এক ঝাপসা ছবি হয়ে । ঘৃণ্য অক্ষম অপদার্থ এক কাপুরুষের মতো । রাস্তাঘাটে ওদের দেখেছে দামি গাড়িতে করে যাতায়াত করতে । ইচ্ছা গেছে এগিয়ে যেতে । ওদের সঙ্গে দুটো কথা বলতে । পরক্ষণেই ধাক্কা খেয়েছে কিসে । যেন সেই ঘষা কাঁচের আস্তরণে । এমনকি আজও এই ভিড়ের মাঝেও সে এক অদৃশ্য মানুষ । খবর পেয়ে ছুটে এসেছে, নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছে এই কদমতলার মোড়ে । ছেলেটাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে । দাঁড়িয়েছে সবার শেষে । চারদিকে চেনা অচেনা নানান মুখ । কেউই যেন চিনতে পারছে না তাকে । কিম্বা হয়তো সযত্নে এড়িয়ে যাচ্ছে । যতই হোক একজন খুনে গুন্ডার জন্মদাতার পিঠে কেই বা আর সান্ত্বনার হাত রাখতে চায় ! 

হঠাৎ কমলেশ্বরের পাশে এসে দাঁড়ায় মঞ্জরী, মান্তুর মা । তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে । বলে, মা ঠিকই বলত । তুমি একটা মেনিমুখো । ভীতু, অপদার্থ । তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না । চিরকাল ভয়ে ভয়ে তাকিয়েই থাকলে । সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠতে পারলে না কোনদিন । নিজের ছেলেকেও মানুষ এত ভয় পায় ! ওকি বাঘ না ভাল্লুক ! বেঁচে থাকলে দেখিয়ে দিতাম আমি । এক দাবড়ানিতে কবে চুপ করিয়ে দিতাম ওর সব ছটফটানি । আজ এই দিন দেখতে হত ! কমলেশ্বর মাথা নাড়ে, ভয় নয় মঞ্জু । অধিকারে বাঁধে । আর সে অধিকার তো তুমিই কেড়ে নিয়েছিলে একদিন । পাঁচ বছরের ছোট্ট একটা চারাগাছ, শিকড় উপড়ে নিয়ে চলে গেলে । মানুষ করলে অন্য মাটিতে, পরপুরুষের কাছে রেখে । কথায় কথায় শেখালে, বাপের মতো মেরুদন্ডহীন হোসনি । একটা চড় খেলে দুটো দিয়ে আসবি তখনই । তোমার মা ননীবালা দাসী, সে তো কোনদিন তোমাদের বাড়িতে ঢুকতেই দিল না আমাকে । মুদিখানা দোকানের সামান্য কর্মচারী, উঠতে বসতে মালিকের খিস্তি খাই । চর থাপ্পরও । আমার নাকি যোগ্যতাই নেই মাগ ছেলে রাখার । মঞ্জরী বলে, সব মা-ই চায় তার মেয়ে সুখে থাকুক । প্রাচুর্যে থাকুক । হাল না ছেড়ে তুমিও তো চেষ্টা করতে পারতে জীবনে উন্নতি করার, রোজগারপাতি বাড়াবার । এতই যখন বুঝেছিলে ভুল আমার, ছেলেটাকেও তো বোঝাতে পারতে । 

মঞ্জরী ভিড়ের মধ্যে মিশে যায় । কমলেশ্বর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । উলটো ফুটে ভজার চায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ায় । জানে বডি আসলেই তাড়াহুড়ো পড়ে যাবে একটা । কটা গুলি লেগেছে, কোনদিক থেকে ছুটে গেছে কোনদিকে ! লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়বে কৌতূহলবসত । কিন্তু তার কোন তাড়া নেই । আজ আর পেটের ধান্দায় এবেলায় বেরোবে না সে । কিই বা হবে এই বয়সে বেশি খাটাখাটনি করে ! একলা মানুষ । একবেলা কোন রকমে জুটে গেলেই হলো । রাতের কথা খুব একটা ভাবে না কমলেশ্বর । একগ্লাস জল খেয়েও শুয়ে পড়া যায় । ভজার দোকানের বেঞ্চে বসে ভাবে সে । কে জানে, মঞ্জরীই হয়তো ঠিক । জীবনে আর একটু যদি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকত তার, আর একটু ভাল থাকা ভাল রাখার চেষ্টা, তাহলে হয়তো সবকিছু খুব অন্য রকম হতো । কমলেশ্বরের মনে পড়ে মুদির দোকানে মঞ্জুর মাল নিতে আসা । তার দিকে তির্যক তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসা । মঞ্জুর মায়ের ভয়ে দুজনের পালিয়ে গিয়ে সিমলাগড় কালিবাড়িতে বিয়ে । তখন কতই বা হবে মঞ্জুর। ষোল কি সতেরো । কচি বয়সে চোখের নেশা, সেকি আর চিরকাল থাকে !  ভাবতে ভাবতে ঝাপসা হয়ে আসে কমলেশ্বরের চোখ । 

 দেখতে দেখতে শববাহী গাড়িটা এসে দাঁড়ায় পাড়ার মোড়ে । লোকজন এগিয়ে যায়, ঘিরে ধরে । কেউ কেউ আবার ছবি তোলে মোবাইল বের করে । খুনে গুন্ডারাও মনে হয় এক ধরনের সিনেমা আর্টিস্ট হয় । তাদের শেষযাত্রাও ধরে রাখতে চায় ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ । কেউ ছবি তুলে, কেউ চোখে দেখে, কেউ বা আবার খবরের কাগজ পড়ে, ভাবে কমলেশ্বর । গাড়ি থেকে নেমে মান্তুর এক শাগরেদ বলে, খুব ভাগ্য ভাল চেনাশোনা একজন ছিল । না হলে লাশ বের করতে কাল দুপুর হয়ে যেত । আর একজন বলে, শালা অতগুলো টাকা নিল, ছবিগুলো দেখাল না । বডিটা কোথায় কিভাবে পড়েছিল...। 

বাতাসে অগুরুর গন্ধ ভেসে আসে । ফুলের মালা হাতে শববাহী গাড়িটার দিকে এগিয়ে যায় মান্তুর ছেলে । ভজার চায়ের দোকানের সামনে থেকে কমলেশ্বর রাস্তা পার হয়ে ধীরে ধীরে চলে আসে এপারে । কাঁচের ভেতর মান্তুর মৃতদেহ। মাথার কাছে ব্যান্ডেজ । অস্বাভাবিক মৃত্যু যখন কাটাছেঁড়া নিশ্চয় হয়েছে । কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে না সেসব । কেবল হাঁটুজোড়া সামান্য মোড়া । গুলির আকস্মিকতা সামলাতে কাত হয়ে গেছে একদিকে । কমলেশ্বর একদৃষ্টে চেয়ে থাকে মান্তুর ঘুমন্ত মুখের দিকে । পিছন থেকে নীচু স্বরে আওয়াজ ওঠে, বলো হরি হরি বোল । দুটো ছেলে মিলে কাঁচের দরজা খোলে । স্ট্রেচারের হাতল ধরে বের করে আনে মান্তুকে । কমলেশ্বরের মনে হয়, মান্তু নয় শববাহী যানের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসছে সে নিজে । আজ এতগুলো বছর পর সে ছুঁয়ে দেখতে পারবে নিজের ছেলেকে । গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারবে যেখানেই থাকিস ভাল হয়ে থাকবি । সামান্য হলেও উপদেশ দিতে পারবে পিতৃত্বের অধিকারে । কমলেশ্বরের বুকের ভেতরটা হঠাৎ-ই পাক দিয়ে ওঠে আজ এই শেষবেলায় ।  

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন