Published Date:10-10-2021
1592644641.jpg?v=2137980370

গল্প

‘আক্রোশে চাই সূর্য হতে, দুঃখে তোমার গান’

দেবকুমার সোম

তেইশে ডিসেম্বর । বৃহস্পতিবার । আজকের ফজ়রের নমায যেন একটু ভিন্ন । বেসুরো লাগে কানে । হয়তো কুয়াশায় জবুথবু বাতাসের ভেদশক্তি ভোরের আযানের সময় কমে গেছে । নেমে গেছে খাদের কিনারায় । ফলে খাঁ–সাহেবের আবাল্য অভ্যাসের সেই কোমল গান্ধার কান অবধি এসে পৌঁছায়নি । কানের পর্দায় ধাক্কা মেরে তাঁকে গাঢ় ঘুম থেকে টেনে তোলেনি । আজ খাঁ–সাহেবের ঘুম ভেঙেছে অতিরিক্ত বেলায় । কলিং বেল–এর আওয়াজে । বেয়ারা ছোকরা খাঁ–সাহেবের পরিচিত মুখ ।সে বকশিসের লোভে বেড টির সঙ্গে ইন্ডিয়া কিংস’এর প্যাকেট আনতে কখনও ভোলে না । আজ খাঁ–সাহেবের ঘুম ভাঙা শরীর যেন তাঁর বশে নেই।মন বেপুথ ।  শীতের কলকাতা এতক্ষণে একটু–একটু করে জেগে উঠছে । আর কিছুক্ষণ পরে পূরবীর স্বামী এসে পড়বেন । আজ প্রিয় ছাত্রীর বাড়িতে খাঁ–সাহেবের দুপুরের নিমন্ত্রণ । সেখানে পারিবারিক বৈঠকে দু–একজন  উঠতি শিল্পীর গান তিনি শুনবেন । কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু উপস্থিত থাকবেন । পুরোন দিনের গালগপ্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়কে মিলিয়ে তাঁরা শহরের মজাদার কিস‌্‌সা শোনাবেন । মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতো স্কচ থাকবে । থাকবে রেশমি কাবাব । কাকোরি কাবাব । আর কলকাতার বিরিয়ানি । চাঁপ । তবুও যেন কিছুতেই বিশ্বস্ত হওয়া যাচ্ছে না আজ । শীত ভোরের কলকাতার সেই পরিচিত সুরভি–সুঘ্রাণের বদলে তাঁর নাকে ক্রমাগত ভেসে আসছে বারুদের তীব্র ঘাতক গন্ধ । ফজ়রের আজানের বদলে তাঁর কানের ভেতর দিয়ে মগজে সাঁ–সাঁ করে ঢুকে পড়ছে বোমাবাজির শব্দ । স‌্‌প্লিন্টার ছিটকে যাচ্ছে জোয়ান ছোকরার হৃদপিণ্ড চারদিকে । নয়–ছয় করে দিচ্ছে ময়দানের ঘোড়াগুলোর চলনফের । পায়রাদের গুলতানিও বধির হয়েছে আজ ।

       আজ নয় । গতকাল ভোর থেকে খাঁ–সাহেবের কন্ঠে কিছুতেই যেন ষড়‌্‌জ লাগছে না । জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই তাঁর ওয়ালিদ‌্‌ অভ্যাস করিয়েছেন ফজ়রের আজান পরবে,তার সঙ্গে শুরু হবে তানপুরায় ডানহাতের তর্জনিকে কথা বলানো । কন্ঠে সরগম । আর যতক্ষণ না সা–এর অন্তরাত্মা ছুঁতে পারছো, ততক্ষণ  চলবে সরগমে আলাপের কোশিস‌্‌ । এখানে শূন্য শতাংশ বিচ্যূতির অবকাশ নেই । জীবন আর মৃত্যুর সংক্ষিপ্ত সীমারেখা যেন । অথচ,গতকাল ভোরবেলায় খাঁ–সাহেব তাঁর ‘সা’ হারিয়ে ফেললেন ! এমন বিপর্যয় তো তাঁর জীবনে আগে কখনও আসেনি ! দেওয়াসের সেই ছোট্ট আমীর আলি,উস্তাদ শাহমীর খাঁ’য়ের প্রজ্জ্বলিত শিখা;ইন্দোরের উস্তাদ রজব আলী খাঁ–য়ের চ্যালা আজ মধ্য পঞ্চাশে এসে বিলকুল খুইয়ে ফেললেন তাঁর ‘সা’ ! খুইয়ে ফেললেন ইমান !

       ‘গুরু বিন জ্ঞান না পাওয়ে’ গতকালের আসরে এই বন্দিশটা গাওয়ার দাবি উঠেছিল । শ্রোতাদের সামান্য চাওয়া । সা–ঋ–গ–ম্ভ্র–প–ধ–ন । অথচ,কোমল ঋষভে পৌঁছানোর আগে সা’তে তাঁর কন্ঠ দাঁড়াবে না এমন বিপর্যয়ের কথা কে ভাবতে পারে ! কাল ভোরের রিযাজে়র সময় নিজেকে মাটির সবচেয়ে তলদেশে নামিয়ে মন্দ্র সপ্তকে যতবার স্বরক্ষেপণ করতে চেয়েছেন আমীর খাঁ–সাহেব,ততবার তাঁর ডানহাতের তর্জনি কেঁপে গেছে । ছুটে গেছে স্বর । বেকার হয়েছে মেহনৎ বারবার ভিণ্ডিবাজারের ওয়াইদ খাঁ–সাহেবের চ্যালার । এত গুণীজনের চ্যালাগিরি করে,দেশে–বিদেশে এত বড়ো–বড়ো অনুষ্ঠান করে এই পড়ন্ত সময়ে এসে তিনি বেমালুম ‘সা’ ভুলে গেলেন ! তাঁকে ছেড়ে চলে গেল তাঁর আত্মা, তাঁর আপন ‘সা ’ ! তার জায়গায় মগজে ভরে উঠল হিজিবিজি ! আবর্জনা ! অথচ,প্রেম–পরিণয়–বিচ্ছেদ থেকে তাঁকে বারবার বঁচিয়েছে তাঁর এই ডানহাতের তর্জনি । তানপুরার তার আর আলজিভের বিভাময় সম্মিলনে কতবার তাঁর জীবনে ঘটেছে ঈশ্বর দর্শন । এতকাল রিয়াযের সময় যখনই তিনি চোখ বুজে তাঁর সা’কে খুঁজেছেন,তখনই তো চোখের ওপর ভেসে উঠেছেন তাঁর ‘নিভৃত–প্রাণের দেবতা’ । মুন্নি বাঈয়ের সঙ্গে ঝগড়া কিংবা তাঁর ওয়ালিদ‌্‌কে উস্তাদ নাসিরুদ্দিন খাঁ–সাহেবের সামান্য সারেঙ্গীবাদক বলে অপমান করা অথবা বিবি আখতারি বাঈয়ের প্রকাশ্যে তাঁকে বক্রকথার ঠেস, সব, সব এই ইন্ডিয়া কিং’এর ধোঁয়ার মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে তখনই, যখন খাঁ–সাহেব তানপুরায় তাঁর আঙুল ছুঁইয়েছেন ।

 

       গত পরশু বিকেলের ফ্লাইটে উস্তাদ আমীর খাঁ–সাহেব কলকাতায় এসেছেন । দুটো প্রোগ্রামে অংশ নিতে । বহুদিন পরে তাঁর ফের শহরে আসা । প্রথমটা ছিল জ্ঞানবাবুর নিজস্ব অনুষ্ঠান । আর একটা আগামীকাল চব্বিশ তারিখে লাহাবাবুদের বাড়িতে । পঁচিশে বম্বে ফিরবেন । খুব আনন্দ নিয়েই তো এবারে তাঁর কলকাতায় আসা । জ্ঞানবাবুর অনুষ্ঠান বলে কথা,সেখানে সেরা–সেরা সব উস্তাদ আর বেগমেরা গাইবেন । কলকাতায় আসা মানে যেন সেই পুরোন দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া ।ভিক্তোরিয়া মেমোরিয়াল‌্‌’এর শুভ্র চাতালে বসে চাঁদনি রাতে গান গাওয়া—মার্বেল প্যালেসের ম্যহফিলে ঝাড়বাতির নীচে অমরের বন্দিশ নিয়ে মীরখণ্ড রচনার স্মৃতিময়তা এক জন্মের নয় ? নিশ্চিত নয় ? নিজা়ম’এর  গোস্ত কাবাব । রয়েল’এর চাঁপ । আমেনিয়ার বিরিয়ানি—জীবনের স্বাদ কিছু কম নয় এই স্মৃতির শহরে ? বেটা হায়দরকে আনতে পারলে সে খুব আনন্দ পেত নিশ্চয় । ...ভেবে রেখেছিলেন জ্ঞানবাবুর আসরে ‘গুরু বিন জ্ঞান না পাওয়ে’ আর ‘লগী লগন জতি পতি সংগ’ পরিবেশন করবেন । মারওয়ায় গুরু বিনের অনুরোধ ছিল খোদ জ্ঞানবাবুর । তিনমাস আগে যখন ফ্লাইটের টিকিট পাঠিয়েছিলেন, তখন থেকেই এই অনুরোধ তাঁর ছিল ।  আর হংস্বধ্বনির লগী লগন সম্পর্কে দাবি ছিল পূরবীর । কারণ এই বন্দিশটা উস্তাদ বাহাদুর খাঁ–সাহেব কোন‌্‌ এক বাংলা সিনেমায় তারানা হিসাবে খানিক গেয়ে খুব জনপ্রিয় করে তুলেছেন । আজকাল অনেকেই ভুল বন্দিশ আসরে পরিবেশন করে নষ্ট করে দিয়েছেন এই গান । যেন জনপ্রিয়তার যাবতীয় মূল নষ্টামি । ফলে বিকৃত বন্দিশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে । গুরুজির কাছে পূরবীর বিশেষ দাবি ছিল হংস্বধ্বনি । তার বদলে রাইসা বেগমের জন্য কে.সি.দাশের রস‌্‌গুল্লার ডিব্বার আর্জি রেখেছিলেন খাঁ–সাহেব । অথচ, সব কেমন ছন্নছাড়া— সদ্য গোঁফওঠা তরুণের নর্দমায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা লাশের মতো হয়ে গেল । খাঁ–সাহেব দিনের চার নম্বর সিগারেটটা ধরালেন । 

 

 

       জ্বলন্ত সিগারেট হাতে হোটেল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছেন উস্তাদ আমীর খাঁ । যাঁর গানের শ্রোতা এই শহরের অলি–গলিতে । যাঁরা পয়সার অভাবে টিকিট কেটে সাধারণ জলসায় প্রবেশের অনুমতি পান না । রাত জেগে ফুটপাতে খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে বাইরে থেকে শোনেন মঞ্চের অনুষ্ঠান । গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড দোকানের বাইরে থেকে দেখেন । কভারে খাঁ–সাহেবের পরিচিত সৌম্যকান্ত ফোটোগ্রাফ । একপিঠে মারওয়া । উল্টো পিঠে দরবারি কানাড়া । জীবনের দুই ভিন্ন পিঠ ।বিপরীতমুখ দুই রাগ । দুই বিপরীত দিকে টেনে রাখা জীবনের গতিমুখ । —সব জাড্য ভেঙে । যেমন স্নেহময় ঈশ্বরের হাতের জাদুতে বাজে জীবন আর মৃত্যুর ছায়াচিত্র । উস্তাদজী জানেন মারওয়া’এর বিস্তার তার সপ্তকে খানিক প্রলম্বিত হলেই রাগের বিচ্যূতি ঘটে যায় । বেসামাল হয়ে খানিকটা যেন সোহিনি রাগের মতো হয়ে দাঁড়ায় । এ–তো জীবনের শিক্ষা । শিল্পের ধর্ম । শিল্পীরও । ‘গুরু বিন জ্ঞান না পাওয়ে’ । গতকাল জীবনের এত বড়ো শিক্ষাটা তাঁর শিল্পের সুষমিত ভিতকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল ! তাই বুঝি আজ ফের সেই সকালের শীত রোদে হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন । কীসের জন্য ? হারিয়ে ফেলা ষড়‌্‌জ খুঁজতে ? কিন্তু জিনিশটা কি হাতের আঙটি ? না মেয়েমানুষের নাকের নথ ? কালও তো ঠিক এই সময় তিনি ঠিক এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিলেন । এই তো ছিল তাঁর লছমনরেখা ।আর নীচে ফুটপাতে মানুষের, কর্মের,সংগ্রামের যৌথ ছবি ফুটে উঠছিল । গাড়ি–বাস–ট্রামের সম্মেলনে এক বেতাল–বেসুর অথচ, মন টানা সংঘর্ষ ভেসে উঠছিল না কি ? কলকাতা বাসের সেই পরিচিত ছবি দেখার মোহমায়ায়, অন্য কোন কারণে নয় । শীত ভোরের নরম স্মৃতিময় শহরটাকে ফিরে দেখার লোভ আর আকাঙ্খা এমন ভয়ানক করে দেবে তাঁকে— তিনি আগে কেন অনুভব করেননি ? সেই কলকাত্তা খতম হয়ে গেছে সে তো সেবার বম্বে গিয়ে পিন্টু জানিয়েছিলেন । ইয়ার পিন‌্‌টো, কত্তদিন বাদ ফির মুলাকাত । হামসফর । হ্যাঁ, পিন্টু ভট্টাচার্য তো খাঁ–সাহেবের হামসফর ছিলেন বটে । টলিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে দু’জনে এক সঙ্গে ট্রাম সফরে বের হতেন । ট্রামের ঠুংঠাং বিচিত্র এক ঘেঁয়ে সুর আর ক্ষণে–ক্ষণে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে বৈচিত্র খুঁজে পেতেন উস্তাদ আমীর খাঁ । তখন তাঁর ভেতরটা উথাল–পাতাল হতো । এক সময় ভিণ্ডিবাজারের একটা ছোট্ট ঘরে এক সঙ্গে বাস করতেন তিনি আর অমন আলী খাঁ । অকালে তাঁকে একা ফেলে রেখে বেহেস্তে চলে গেছেন জিগরি দোস্ত । তাঁর বন্দিশ যেন রূপ পেত ট্রামের চাকার ঘটাং–ঘট, ঘটাং–ঘট বিচিত্র কোলাহলে । মূলতানি রাগে ‘জাকো মন আল্লাহ‌্‌ সংগ রহত’—সারাজীবন এই বন্দিশকেই ধ্রুবপদ মেনে এসেছেন । আর আজ এমন জীবনে এসে তিনি পড়লেন ‘সা’তে ‘সা’ লাগাতে পারছেন না !

 

       কালকের অনুষ্ঠানে তিনি সকলকে এক সঙ্গে হতাশ করেছেন । মারওয়া ঠাটে যখন তিনি কোমল ঋষভ আর শুদ্ধ ধৈবত প্রয়োগ করলেন,তখন বোঝা গেল মারওয়া নয়, খাঁ–সাহেব ললিত পরিবেশন করছেন । মারওয়া’তে কোমল ঋষভ আর কড়ি মধ্যম ছাড়া বাকি সব স্বর যে শুদ্ধ । এখানে পঞ্চমের কোনও অবস্থান নেই । পঞ্চম স্বর যেন দীন,হীন সেই হাড় হাভাতে শ্রোতৃমণ্ডলি, যাঁদের স্থান হয় না সুশোভিত অনুষ্ঠানের আসরে । যাঁরা গ্রামোফোনের রেকর্ড দেখেন দোকানের শো–কেসের বাইরে থেকে । মারওয়া’তে সা’য়ের ব্যবহারও সীমিত গতকাল পরিবেশনের সময় সেটা বেশ টের পেয়েছেন খাঁ–সাহেব । এতদিন মারওয়া’র যাবতীয় সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মীরখণ্ডে আমিরি চাল যিনি দিয়ে এসেছেন,সেই শিল্পী সুধীজনের সঙ্গে প্রতারণা করলেন ! সময়টা ছিল দরবারি কানাড়ার, অথচ, খাঁ–সাহেব তাঁর অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন ললিতে । বিলম্বিত লয়ে যখন তিনি রাগের বিস্তারে যাচ্ছিলেন, তখন ধীরে–ধীরে কোকঃনদের মতো ফুটে উঠছিল বিষাদ রাগিণী । তৈরি হচ্ছিল শোকের মুহূর্ত । আর বন্দিশে যখন বিলম্বিত লয়ে মন্দ্র সপ্তকে বিচরণ করছিল তাঁর কন্ঠ, যখন কড়ি আর কোমলে ছুঁয়ে–ছুঁয়ে তিনি বাক‌্‌ময় করছিলেন ললিত চরিত্র, তখন তো তাঁর ভেতর–ভেতর বয়ে যাচ্ছিল ঝড় আর শ্রাবণধারা । তার কতটুকু তিনি যোগ করতে পেরেছিলেন সমবেত দর্শক মনে ? সেখানে যাঁরা বোদ্ধা শ্রোতা,এই ঊনিশশো একাত্তর সালের কলকাতায় সুসজ্জিত পোশাকে জড়ো হয়ে ছিলেন, যাঁরা ইডেন গার্ডেন্স’এ পতাউদির নবাবের বাটিং দেখতে সানগ্লাস আর বাইনোকুলার নিয়ে ভিড় জমান,যাঁরা গ্র্যান্ড হোটেলের বলরুম আর ট্রিংকার্স’এর নাচঘর আলো করেন,তাঁদের মধ্যে একজনও কি সাচ্চা আদমি ছিলেন, যিনি বুকে  দম নিয়ে বলতে পারবেন বাইরে কেন এনকাউন্টারে এত তরুণ–তরুণী লাশ হয়ে যাচ্ছেন ? সেই হন্যমান যৌবনের দলই তো খাঁ–সাহেবের কাছে পঞ্চম । তাঁরাই যে রাত জেগে ফুটপাতে বসে তাঁর গান শুনে এসেছেন এতদিন !

 

       কালকের অনুষ্ঠান বেশ সংক্ষেপে শেষ হয় । বিদায়ের মুহূর্তে বড়ো শার্মিন্দা বোধ করেছিলেন তিনি । তখন মঞ্চে  উঠেছেন অন্যতম কিনারা ভাস্কর পণ্ডিত ভীমসেন যোশী । অনুষ্ঠান শুরুর আগে পণ্ডিতজী অনুরোধ করেছিলেন তাঁর পরিবেশন শুনে যেতে । পাহাড়ি সান্যাল মশাইও সেখানে ছিলেন । কথা চালাচালি হচ্ছিল বেশ । খাঁ–সাহেবের সেদিকে যেন মন ছিল না বিশেষ । চুপিসারে অনুষ্ঠানের মাঝখানে নিতান্ত অভদ্রের মতো গাড়িতে উঠে বসেছিলেন । র‌্‌ স্কচ গলায় ঢেলে ড্রাইভারকে স্বভাব বিরুদ্ধ গলায় হুকুম দিয়েছিলেন— বাবুঘাট ।

       বাবুঘাট তাঁর যাওয়া হয়নি । শীতের কলকাতার রাত আজকাল যেন প্রেতপুরি । চারিদিকে লাশের দুর্গন্ধ;যেন গোটা শহরটাই গেরস্থান হয়ে গেছে । খাঁ–সাহেবের হুকুমে গাড়ি শহরের আলো জ্বলা নির্জন রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়িয়েছে । কোথাও কোনও শান্তি নেই । বিরাম নেই এনকাউন্টারের । যেন দফনের মিছিলে পা মিলিয়েছেন তিনি । এমন শহর তো তাঁর জানা ছিল না ! জীবনের এমন অপচয় ! সময়ের কাঁটা ঘুরে ২৩শে ডিসেম্বরের সরণীতে যখন পা রেখেছে রাত,তখন প্রায় বেহুঁশ, বিপর্যস্ত অবস্থায় হোটেলে ফিরেছিলেন ‘সা’ হারানো, সব হারানো উস্তাদ আমীর খাঁ ।

 

       সময়ের বেশ কিছুটা আগেই পূরবী তাঁর স্বামীকে পাঠিয়ে দিয়েছেন গুরুজিকে নিয়ে যেতে । প্রদ্যুম্ন মুখোপাধ্যায়  টু–পিস‌্‌ স্যুটে সাহেবিকেতায় এসেছেন । তাঁকে দেখে প্রসন্নতা আসে । গুরুজির দিকে একটা ইন্ডিয়া কিং বাড়িয়ে দিলেন । হাসি–হাসি মুখে লাইটার জ্বালিয়ে এগিয়ে দিলেন । খাঁ–সাহেব মন্থর । যেন মন্দ্র সপ্তক থেকে আরও খাদে নেমে গেছে তাঁর  জলদ গম্ভীর স্বরক্ষেপণ । আনত মুখ আগুনের সামনে এগিয়ে দিলেন তিনি । তারপর দীর্ঘ চোখ বুজে লম্বা টানে অনেকটা  ধোঁয়া ফুসফুসে ঢুকিয়ে নিলেন । গুরুজির পরনে সাবেক সাদা চুড়ি পাজামা আর কালো গলাবন্ধ । মোটা কালো ফ্রেমের চশমা ছাপিয়ে তাঁর দু চোখের দৃষ্টি ঈষদ রক্তিম । এই অভিব্যাক্তি অচেনা মিস্টার মুখোপাধ্যায়ের কাছে । শিল্পীদের মেজাজ মর্জি সব সময় বোধগম্য নয়— হয়তো... ।

       জনাব,মাফি মাংতা হুঁ । ম্যায় শর্মিন্দা হুঁ । কথা–সাহিত্যে প্রগাঢ় বোধ সম্পন্ন পুরুষটি হঠাৎ যেন মুখের সঙ্গত বুলিও হারিয়ে ফেলেছেন । যেন প্রদ্যুম্নবাবুর বোধের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন তাঁদের গুরুজি । এমন মনে হওয়া এখন এখানে যেন সঙ্গত মনে হয় । মানে !

       ম্যাঁ ওয়াপাস‌্‌ যা রাহা হুঁ ।

       আপকী তবিয়ৎ ?

       তবিয়ৎ আমার ঠিক আছে পদ্দুন্নবাবু । কিন্তু আমাকে এই মুহূর্তে ফিরে যেতে হচ্ছে । পুর্বি বেটিকে বলে দিবেন যেন কিছু মনে না করেন ।

       কিন্তু গুরুজি আপনার জন্য কতো মান্য–গণ্য মানুষ আজ আমাদের বাড়িতে আসবেন । কতো আয়োজন করেছেন পূরবী । আপনাকে সঙ্গে করে নিয়ে না যেতে পারলে আমি কী উত্তর দেবো তাঁকে?আর তিনিই বা আগতজনদের কী বাহানা দেবেন ? আপনি দয়া করে আমাদের এমন সংকটে ফেলবেন না গুরুজি । প্লিজ... । প্রদ্যুন্মর নিজেকে বেসামাল মনে হয় । তাঁদের আজ যে বড়ো অসম্মান হয়ে যাবে !

       খাঁ–সাহেব বাড়তি কোন কথা বলেন না । সিগারেটে লম্বা টান দেন । হোটেল ব্যালকনির রেলিঙে দু হাত রেখে শরীর ঝুঁকিয়ে দেন সামনের দিকে—যেন এখন তাঁর আশপাশে কেউ নেই । যেমনটা হয় মঞ্চমায়ায় দর্শক উপস্থিতি । তেমন ডিসলভ‌্‌ড ।

 

 

       গতকাল ভোরের আজানের সময় তিনি যখন এই জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন,তখন ভোরের কুয়াশামাখা ভালোবাসার স্মৃতির শহরের প্রতি তাঁর প্রেম উপচে ওঠার বদলে ঘৃণায় ভরে উঠেছিল । উল্টোদিকের ফুটপাতের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নর্দমার ভেতর মুখ গুজে পড়ে থাকা এক তরুণের লাশ উস্তাদ আমীর খাঁ–সাহেবের কন্ঠনালীর ভেতর ষড়‌্‌জ থেকে নিষাদ অবধি সাত–সাতটা স্বরকে কেড়ে নিয়েছে । নীল শার্ট । কালো ট্রাউজা়র । খালি পায়ের একটা নর্দমার ভেতরে । লাশ হয়ে যাওয়া এক সদ্য তরুণ । মুখ দেখা যায় না । পিঠে দগ‌্‌দগে বুলেট চিহ্ন— তখনও তাঁর শরীর থেকে টাটকা রক্ত ঝরছে সদ্য ঘটে যাওয়া এনকাউন্টারের প্রমাণসরূপ । 

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন