Published Date:10-10-2021
1601928749.jpg?v=1137550232

গল্প

উকুন

সোমনাথ বেনিয়া

উকুন বলে কি মানুষ নয় ! তাদের মন আছে, আছে ভাবনা । সংসার আছে, আছে পরিজন । এক‌ই সঙ্গে ঘরকন্না করার ভালোলাগা আছে । আছে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা । তাই সুখ-দুঃখ আছে যেমন, তেমন আছে বিচ্ছেদের ভয় । তাই যতটা সাবধানে থাকা যায় । প্রতিটি পদক্ষেপে নখে পিষে মরার ভয় । চিরুনির মারণ আঁচড়ে টুক করে ফুট হয়ে যাওয়ার ভয় । এত কিছুর মধ্যে থাকতে তো হবে । বাঁচতে তো হবে । এখন সেই উকুন তার স্ত্রী আর একমাত্র সন্তান নিয়ে বাসা বেঁধে ছিলো মেয়েটির মাথায় । বেশ ভালো মাথা ! লোভনীয় মাথা । বেশ নরম, তার উপর সুন্দর পুষ্টিকর ঘিলু ভর্তি মাথায় গরম-গরম সুস্বাদু রক্তরস । ভাবা যায় ! সব থেকে ভালো বিষয় হলো মেয়েটি ঘন ঘন শ‍্যাম্পু করে না । যখন-তখন মাথায় ভিনিগার লাগায় না কিংবা লেবু আর টক দ‌ইয়ের মিশ্রণ চুলে মাখে না । কাজের কাজ যেটা করে সেটা হলো চুলগুলোকে বেশিরভাগ সময় তেলে চুপচুপে করে রাখে । যদিও এই বিষয়টি তার প্রেমিকের পছন্দ নয় । তা না হোক, এক্ষেত্রে একটি উকুনে পরিবার বসবাস করার জন‍্য তাদের আদর্শ পরিবেশ পাচ্ছে, এটাই বড়ো কথা । এদিকে মেয়েটি চাকরি করে । তাই নিত‍্যদিন তাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে হয় । এর ফলে ধুলো-বালি-ধোঁয়া চুলে মাখো-মাখো অবস্থায় থাকে । এইরকম একটি মনোরম পরিবেশে থাকতে কোন উকুনের না ভালো লাগবে ! শুধু সমস্যা হয় মেয়েটি যখন বাসে চড়ে অফিস যায় । তখন বাসের ঝাঁকুনিতে সেই উকুনে পরিবারের কর্তার একটু বেশি কষ্ট হয় কারণ অল্প-বিস্তর বয়স হয়েছে । গাড়ির ঝাঁকুনিতে মানুষের মাথা মাথায় ঘষা খাচ্ছে । এর তার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে । শরীরের সব অঙ্গ নড়ছে । ফলত তাদের বিশেষ করে সেই উকুন কর্তার মাথান্তর বা দেহান্তর হ‌ওয়ার ভয় একটু বেশি থেকে যাচ্ছে । দাঁত তুলনামূলক ভাবে বেশি দুর্বল হ‌ওয়ায় জোরে কামড়ে ধরে এক জায়গায় বেশিক্ষণ পড়ে থাকতে পারে না । তাই ঝাঁকুনি এলেই তার স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র সন্তান তাকে জাপটে ধরে রাখতে চায় যাতে কোনো অঘটন না ঘটে ।

     একবার প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে সেই কর্তা উকুন পিছলে গিয়ে মেয়েটির কাঁধ বেয়ে বুকের উপর গড়িয়ে একেবারে স্তনের বোঁটায় এসে হাজির । এদিকে কর্তাকে দেখতে না পেয়ে স্ত্রীর ও সন্তানের ভয় ধরে গেল । মানুষ ওরফে উকুনটা এই অসময়ে গেল কোথায়? দু-জনে মিলে এবার সারা মাথা ঘুরে খুঁজতে লাগলো । মা তার সন্তানকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলো যে ঘুরতে-ঘুরতে খুঁজে না পেয়ে হতাশায় হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে মাথায় কামড় না বসায় । তাতে মৃত‍্যুনামক নখের আতঙ্ক থাকতে পারে । সন্তান তার বাবার মতোন শান্ত ও বুদ্ধিমান হয়নি । হয়েছে রগচটা এবং বোকাটে ধরণের । এদিকে সেই কর্তা উকুন স্তনের বোঁটায় ঝুলতে-ঝুলতে দেখে এ তো এক অন‍্য দ্বীপ । সুডৌল, নিটোল, পুরুষ্টু, মাংসাল দ্বীপ ! তাহলে কি তার দ্বীপান্তর ঘটে গেল ? সে এখন তার পরিবারের কাছে কীভাবে ফিরবে ? আজকে সাবধানে থাকতে পারেনি । অসাবধানতাবশত পা পিছলে গেছে । তার মধ‍্যে বাসে প্রচণ্ড ভিড় । তাছাড়া কোন রাস্তা দিয়ে আজকে গাড়িটা যাচ্ছে কে জানে ! এত ঘন ঘন ঝাঁকুনি । সেই স্তনের বোঁটায় কর্তা উকুন এইসব কথা ভাবছিলো । এমনসময় সে খেয়াল করলো কনুইয়ের মতো কিছু একটা এসে তাকে বারবার আঘাত করছে । এ তো ভারি মুশকিল হলো ! আঙুল হলে স্পষ্ট বোঝা যেতো কারণ এতক্ষণে তার পিষে দলাইমলাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো । মেয়েটি নিশ্চয়ই এতো ভিড়ে নিজের কনুই দিয়ে তাকে আঘাত করতে আসবে না । তাছাড়া সে তো ঝুলে আছে । প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করছে । সেভাবে কামড়েও ধরেনি । তবে! ক্ষণিক থমকে সে বুঝতে পারে এটা হলো কোনো তৃতীয় পক্ষের কাজ মানে হাতের কনুই । ব‍্যাটা ভারি নচ্ছার । ভীষণ অসভ্য । ভিড় বলে সুযোগ নিচ্ছে । তার তো খেয়াল পড়ে না তাদের সমাজে এরকম হয় কিনা । সে ভাবে দেবো নাকি ব‍্যাটার কনুই কামড়ে । না থাক, কামড়াতে গেলে যদি সে পড়ে যায় । এই ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়ে । তাছাড়া অন্তর্বাসের উপর দিয়ে তার দাঁত কনুই পর্যন্ত পৌঁছাবে না । তাই সে তৃতীয় পক্ষের অভব‍্য আচরণ নিরুপায় হয়ে মেনে নিয়ে তাকে অভিশাপ দিলো এই বলে, "তুই একটা অসভ‍্য লোক । তোর মাথায় উকুন হোক । ওরা দিন-রাত তোকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক !"

     এদিকে ততক্ষণে তার ব‌উ আর ছেলে তাকে ঘুরে-ঘুরে এসে সেই জায়গায় পেয়ে যায় । যেমন‌ই পাওয়া, ঠিক তেমনই দেখানো ! তার ব‌উ তাকে ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দিলো । বলে, "বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে ! ঘরবাড়ি, ব‌উ, ছেলে সবাইকে ছেড়ে এতো ছোঁক-ছোঁক বাই কোথা থেকে আসে শুনি ।" কর্তা উকুন যতবারই বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে বাসের ঝাঁকুনিতে পিছলে গিয়ে এখানে এসে পড়েছে, তা কে শোনে তার কথা । তার ব‌উ কাঁদতে থাকে । "জানো আর একটু হলে তোমার ছেলে মরতে বসেছিলো ।"

"কেন কী হয়েছে ?" জিজ্ঞাসা করলো কর্তা উকুন বেশ করুণ সুরে

"কী আবার হবে ! বললাম ঘাড়ের উপর দিয়ে নামতে যখন হবে তখন অত তাড়াতাড়ি করে নামার দরকার নেই । থমকে-থমকে নামতে বললাম । কিন্তু শুনলে তো আমার কথা ! হুড়মুড়িয়ে নামতে গেল । তা ঘাড়ের উপর দিয়ে ওই ভাবে নামতে গেলে যার তার সুড়সুড়ি লাগবে সে তো তুমি জানো । ওর ওই হুড়মুড়িয়ে নামার জন‍্য মেয়েটা ভাবলো ঘাড়ের উপর কিছু একটা বাইছে । খুবই স্বাভাবিক ব‍্যাপার । আমাদের ঘাড়ে যদি কিছু বাইতো তো কী করতাম! অমনি মেয়েটা তার বাঁ-হাতের বড়ো নখ‌ওয়ালা আঙুল চালিয়ে দিলো । ঠিক সময়ে তোমার ছেলেকে সরিয়ে আনতে না পারলে আজ তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতো । কর্তা উকুন আগা-গোড়া সমস্ত বিষয়টি ভালো ভাবে উপলব্ধি করে তাদেরকে নিয়ে পুনরায় অতিসন্তর্পণে স্তন বেয়ে কাঁধের উপর দিয়ে ভয়ে-ভয়ে থেমে-থেমে মাথায় ফিরে গেল । এতক্ষণ তৃতীয় পক্ষের কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে তার একহাত জিভ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো । সে ভীষণ হাঁপিয়ে গেছে । যাই হোক তারা সবাই মাথার গরম-গরম রক্তরস মাখানো ঘিলু খেয়ে শান্ত হলো । তিনজনে স্বস্তির শ্বাস ফেলে একসঙ্গে জড়াজড়ি করে বসে র‌ইলো । 

     হঠাৎ একরাতে মেয়েটি কী কারণে ঘ‍্যাঁচোর-ঘ‍্যাঁচোর করে তার মাথা চুলকাতে শুরু করলো । তার দু-হাতের বিশেষ করে বাঁ-হাতের বড়ো-বড়ো নখের আনাগোনা বারবার হতে লাগলো । এতে উকুনে পরিবার ভীষণ ভয় পেয়ে গেল আর কিছু বোঝার আগেই একটি নখের আঁচড় গৃহকর্ত্রীর পায়ের উপর এসে পড়লো । ব‍্যথায় আর্তনাদে সে চিৎকার করে উঠলো । বাকি দু-জন এটা দেখে হকচকিয়ে গেল । একী শুরু হলো হঠাৎ করে ! এরকমটা তো আগে হয়নি কোনোদিন । ব‍্যথায় কোঁকাতে-কোঁকাতে কর্ত্রী উকুন কর্তা উকুনকে জিজ্ঞাসা করলো, "হ‍্যাঁ গো, কী হয়েছে কিছু জানো । তুমিতো সারা মাথা ঘুরে বেড়াও । আমরা তো প্রায়শ এক জায়গায় বসে থাকি । কোথাও খাবারের ভালো গন্ধ পেলে আমাদের ডাকো । তখন যাই । এ তো ঝড় শুরু হয়ে গেল !" কর্তা উকুন প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি । পরে ধারণা করলো যে আজকে মেয়েটির সঙ্গে তার প্রেমিকের একচোট ঝগড়া হয়ে গেছে । কী নিয়ে ঝগড়া হলো তা খুব একটা ঠাওর করতে পারেনি । তবে সে শুনেছিলো, "যদি আমাকে তোমার না পোষায়, তবে ছেড়ে চলে যেতে পারো !"

"কারণ কিছু জানতে পারলে ?"

"আবছা ভাবে কানে যেটুকু আসলো তাতে বুঝলাম ছেলেটি হয়তো বলতে চাইছে যে তুমি পরিস্কার থাকতে পারো না । মাথায় চপচপে তেল দিয়ে রাখো । কেমন একটা বোটকা তেলচিটে গন্ধ বের হয় । শ‍্যাম্পু করো না বলেই মনে হয় । এইসব আর কী !" এই শুনে স্ত্রী উকুন আঁতকে উঠে বলে, "এবার কী হবে গো । যদি মেয়েটা ভালো করে মাথা পরিস্কার করে, রোজ-রোজ শ‍্যাম্পু করে, তার উপর মেডিকেটেড শ‍্যাম্পু দিলে আমাদের তো আর রেহাই নেই । এই বয়সে এসে ঘর গেরস্থালি ত‍্যাগ করতে হবে । মাথা থেকে মাথান্তর হতে হবে । কার মাথায় যাবো গো ? এ আমাদের কী সর্বনাশ হোলো গো !" বাচ্চা উকুন সব কথা মন দিয়ে শুনছিলো । শুধু মায়ের কথায় সায় দিয়ে ছলছলে চোখে চুপ করে র‌ইলো ।

     এদিকে মেয়েটি দিন-দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে । তার মধ্যে যেনো একধরণের ভৌতিক আচরণ খেলা করছে । এখন আর বাইরে কাজে বের হয় না । সারাদিন ঘরেই থাকে । থেকে-থেকে ঘ‍্যাঁচোর-ঘ‍্যাঁচোর করে মাথা চুলকায় । চিৎকার করে । দেওয়ালে মাথা ঠোকে । কখনো কাঁদছে । আবার কখনো-বা মৃদু হাসছে ছলছলে চোখে । থেকে-থেকে নিজের চুল ধরে টানছে । মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি ? হতেও পারে । এত বছরের প্রেম হারানোর দুঃখ ভীষণরকম হৃদয়বিদারক । তবে স্ত্রী উকুনের এই বিষয়ে কিছুটা মন খারাপ থাকলেও, কর্তা উকুন ও তার ছেলে উকুন দু-জনে খুব খুশি কারণ মেয়েটি যদি পাগল হয়ে যায় তাহলে সে আরও বেশি আলুথালু হয়ে থাকবে । আরও বেশি অপরিস্কার থাকবে । মাথায় জট পড়বে । প্রচুর নোংরা জমবে । এই তো সুবিধা । কর্তা উকুন অনেকদিন ধরে ভাবছিলো যদি তাদের বাসস্থানকে আরও একটু সুন্দর করে তোলা যায় । এই তো উপায় । এটাও ঠিক যে উন্মাদ হলে নিজের চুল টেনে ধরবে, ছিঁড়বে, মাথার তালুতে ঘন ঘন আঁচড় দিয়ে টানবে । এতে মৃত্যু ভয় একটু বাড়বে ব‌ই কমবে না । কিন্তু সব জায়গায় রিক্স ফ‍্যাক্টর কাজ করে । একঘেয়েমি জীবনে একটুআধটু রোমাঞ্চ না থাকলে হয় । খালি খাও-দাও আর ঘুমাও । কেমন একটা ম‍্যাড়মেড়ে জীবন । কর্তা উকুনের কথা সত্যি করে দেখা গেল মেয়েটি ছেলেটির সেই বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেনি । বাস্তবে পাগল হয়ে গেছে ! এখন মেয়েটির সর্বনাশ আর তাদের পৌষ মাস । কর্তা উকুন তার ব‌উকে আর ছেলেকে ভালো করে বোঝালো যাকে বলে মগজ ধোলাই করলো, বললো, "ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন‍্য করেন । মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে । ঠাকুরের কাছে সবাই মিলে প্রার্থনা করবো যেনো মেয়েটি আর সুস্থ না হয় । মেয়েটা যত খারাপ থাকবে আমাদের ততো পোয়াবারো । আমরা পরজীবী । পরের উপর নির্ভর করে জীবনযাত্রা অতিবাহিত করতে হয় । সুতরাং সে যদি কোনো কারণে ভালো হয়ে যায় তাহলে আমাদের জীবনযাপন আবার খারাপের দিকে এগোবে ।" মেয়েদের মন বলে কথা ! তাই স্ত্রী উকুনের একটু মন খারাপ থাকলেও কর্তা উকুনের কথায় সায় দিয়ে তারা প্রার্থনা করতে লাগলো যে মেয়েটি যেনো সুস্থ না হয় । আর এখানেই ঘটলো সেই ঘটনা । চিকিৎসার জন্য মেয়েটিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো ।

     হাসপাতালে চিকিৎসা চলবে । সুতরাং তাকে আলুথালু বা নোংরা অবস্থায় থাকলে তো চলবে না । পরিস্কার হয়ে থাকতে হবে । তাই যথারীতি ওষুধ পথ‍্যের সঙ্গে নিয়মিত তার শরীরের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার উপর নজর রাখা শুরু হলো । একদিন কর্তা উকুন দেখলো সেই প্রেমিক ফিরে এসেছে । তাকে দেখে সে একটু অবাকই হলো । এই ছেলেটি এতদিন পর হাসপাতালে কী করতে এসেছে ! তাহলে তাদের বিচ্ছেদ হয়নি ? কী ব‍্যাপার ! ভালো করে বুঝতে হচ্ছে । বেডের পাশে একটা চেয়ারে বসে ছেলেটি মেয়েটির হাত ধরে আছে । মেয়েটি শুয়ে আছে । ছেলেটি মেয়েটির মাথার কাছে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলতে শুরু করলো, "আমি সব জানতে পেরেছি । আমি তোমাকে ভুল বুঝেছি । আমাকে ভালো রাখার জন‍্য, সুখে রাখার জন‍্য, তুমি সেদিন অভিনয় করে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলে । আমাকে তোমার যন্ত্রণার কথা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দাওনি । আমাকে তুমি একবারও বললে না যে তোমার ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে । অপারেশন করতে হবে । তোমার প্রাণ সংশয় হতে পারে । বাড়ির কাউকে পর্যন্ত জানাওনি । এতো বড়ো আত্মত‍্যাগ ! বাড়ির একা রোজগেরে বলে চুপচাপ মেনে নিয়েছিলে তোমার নিজের এই অমানুষিক যন্ত্রণা । সেদিন যদি বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে না যেতে আর তোমার বাড়ির লোক যদি আমায় ফোন না করতো, তাহলে কিছুই জানতে পারতাম না । এখন তোমাকে তাদের আর আমার জন‍্য বাঁচতে হবে । তোমার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমার পাশে থাকবো । কথা দিলাম । অপারেশন হোক । দেখো, তুমি ঠিক ভালো হয়ে যাবে । যাই হোক তুমি জানবে আমি সারাটা জীবন তোমার‌ই আছি, তোমারই থাকবো ।" এই শুনে কর্তা উকুন নিজের মাথা চুলকাতে শুরু করলো । তাহলে, এই ব‍্যাপার ! এখন সে ভাবছে ব্রেন টিউমার জিনিসটা কী ? মাথার নিশ্চয়ই কোনো ভয়ানক রোগ হবে । কর্তা উকুন এখন মাথা নাড়তে-নাড়তে বলছে, "ও তাই ভাবি ! ইদানীং ছেলের কেন খাবার মুখে রোচে না । যেখান থেকেই রক্তরস মাখানো ঘিলু খেতে বলি, সে খালি বলে খাবার থেকে কেমন একটা বোটকা গন্ধ বের হচ্ছে । আমিও পায়নি তা নয় । ভাবতাম রোজ-রোজ একই স্বাদের খাবার, তা আর কী ভালো লাগে । একটু পরিবর্তন হলে তো ভালোই হয় । এখন বুঝলাম সমস্তটা এই রোগের জন‍্য হয়েছে । এবার কী হবে ?" মানুষের সমাজের রোগের চিকিৎসা তো তার জানা নেই । কোথা থেকে কী হবে ভেবে তারা ভয়ে-ভয়ে থাকতে লাগলো । এইবার বুঝি আর রক্ষে নেই । এতকালের ভিটেমাটি এবার না ছাড়তে হয় । 

     সেদিন তারা খেয়াল করলো ধারালো ব্লেডের মতোন কী একটা জিনিস মাথার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে । আর যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার চুলগুলি ঝরে পড়ছে । এখন তারা আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে আছে । ব্লেডের মতোন জিনিসটা ক্রমশ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে । যতো এগিয়ে আসছে তারাও ধীরে-ধীরে এদিক-ওদিক সরে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে । একসময় এক ঝটকায় তাদের বাসস্থান সেই যন্ত্রের ধাক্কায় উড়ে গেল । তারাও একদলা চুলের সঙ্গে এসে পড়লো মেঝেতে । এখন তাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে । আতঙ্কে, ভয়ে, ভিটে হারানোর দুঃখে তারা আর্তনাদ করে উঠলো । তারা মৃত‍্যুকে সাক্ষাৎ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে । আর উপায় নেই । মৃত্যু এত সুলভ তাদের কারোর জানা ছিলো না । পরজীবী হয়ে বাঁচার জন‍্য পরের ক্ষতি চাইতে গিয়ে নিজেদের অজান্তে তাদের‌ই চরম ক্ষতি হয়ে গেল । তারা খেয়াল করলো লম্বা গোছা চুলের মতোন কিছু একটা জিনিস তাদেরকে সেই জায়গা থেকে অন‍্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । উকুনগুলো ভাবছে মেয়েটির আজ অপারেশন । তারপর তার গন্তব্য কোথায় কে জানে, কেই-বা খবর রাখবে তাদের জীবন কোনদিকে যাচ্ছে ...

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন