গল্প
কিংশুক কোথায় যাচ্ছো
শিখর রায়
অজানা, অচেনা একটা স্টেশনের প্রায় নির্জন এক প্ল্যাটফর্মে, লোহার কাঠামো বন্দী সবুজ কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো একটা বেঞ্চের একধারে, বাঁকানো লোহার হাতলে হাত রেখে একাই বসেছিল কিংশুক । ব্রিটিশ স্মৃতিবাহী এধরণের বেঞ্চ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আজকাল আর দেখা যায় না । সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চরা এখন তাদের পদচ্যুত করে সেই জায়গা নিয়েছে । চক্ষু পীড়াদায়ক, কিন্তু তুলে নিজের জিনিস বলে নিয়ে চলে যাওয়া যায় না ।
স্টেশনটা ছোট । কিন্তু জংশন । একটু হেঁটে প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে গেলে বোঝা যায় । লাইনটা সেদিকে একটু এগিয়ে দুভাগে ভাগ হয়ে দুদিকে চলে গেছে । জায়গাটা বিশেষ বড়, জনবহুল নয় সম্ভবতঃ । স্টেশনের একদিকেই টিকিটঘর, অফিস ইত্যাদি । সেদিকেই দোকান, বাজার, কিছু বাড়ি ঘর চোখে পড়ে । অন্যদিকে প্ল্যাটফর্মে রেলিঙের পরেই বিশাল পুকুর । দীঘি বলাই ভালো । তার ওদিকে তার পাড় বেয়ে ক্ষীণকায় রাস্তা । তারও পরে কিছু বাগান ঘেরা বাড়ি ঘর ইত্যাদি । লাইন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগোনোর প্রায় পরে পরেই দু'পারে গাছপালার ছাউনি অথবা উধাও ধানক্ষেত । চারদিকে বেশ শান্তি শান্তি, নরম নরম ভাব ।
সূর্য ডুবে গেছে । আলো যায় নি এখনও । আকাশে রঙের খেলা চলছে । চারদিকে মায়াবী বিষণ্নতা । হেমন্তের শুরু । বাতাস সুখ শীতল । কিংশুক দুদিকে সার বেঁধে পত্রগুচ্ছে ছত্রধারী গাছ । সেইসব গাছে গাছে কুলায় ফেরা অজস্র পাখির কোলাহল, কথাবার্তা, খুনসুটি, জায়গা নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি তার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিল । তখনও কিছু কিছু পাখি দল বেঁধে কিম্বা একলাই এদিক ওদিক থেকে উড়ে এসে ঝুপঝাপ গাছগুলোর পত্রগুচ্ছদের আড়ালে ঝাঁপ দিয়ে কোথায় কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিল । এর এক একটা বৃক্ষ্মাবাসের পত্রাচ্ছাদিত শাখা প্রশাখায় তাদের নিজের নিজের রাত্রিবাসের এক একটা জায়গা চিহ্নিত আছে । যে নির্দিষ্ট আরামে তারা ফিরে আসে প্রতি দিনশেষে । সূর্য্য উঠলে আবার উড়ে যায় খাদ্যসন্ধান এবং জীবন যাপন খেলায় দিন কাটাতে ।
কিংশুক একটা দীর্ঘ: নিশ্বাস ফেলল । তারও একটা নির্দিষ্ট বৃক্ষ্মাবাস আছে । সেখানে তার নির্দিষ্ট শাখায় নির্দিষ্ট বাসস্থান আছে । পত্রাচ্ছাদিত । তারও একটা জুড়ি আছে । একটি ছানা শাবক । ঠিক সূর্য্য ওঠার পরেই না হলেও, কিছু পরেই সেও বেঁচে থাকার রসদ আহরণ প্রয়াসে তার বৃক্ষ্মাবাস ছেড়ে বেরিয়ে যায়, ওরাউড়ি করে অা-সন্ধ্যা দিনযাপন করে । আবার সূর্যাস্তের পর দিনশেষে তার নির্দিষ্ট বৃক্ষ্মাবাসের পত্রাচ্ছাদিত নির্দিষ্ট শাখার নির্দিষ্ট আবাসে ফিরে আসে । আজ যে কি হয়ে গেল ! আজ নয়, বস্তুত: গতকাল থেকেই,- -। কাল সূর্যোদয়ের পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ে ঠিকঠাকই সে পাখা মেলেছিল বৃক্ষ্মাবাস ছেড়ে, রসদ আহরণের নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিদিনের মত পৌঁছেও গেছিল, - - তারপরই কি যে হয়ে গেল !
পাখিদের সঙ্গে মানুষের মিল খোঁজা ভীষণই অর্থহীন একটা ব্যাপার । পাখিরা শুধুমাত্র খাদ্যকণা ই আহরণ করে, তাও তাৎক্ষণিক ক্ষুন্নিবৃত্তিতে । সঞ্চয়ের কোন ব্যাপারই তাদের নেই । খাবার জোগাড়ের দায়ও যার যার, তার তার - । শুধুমাত্র নিজে খাওয়া ছাড়া কাউকে খাবার বয়ে নিয়ে গিয়ে খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই । শখ - শৌখিনতা আছে কিনা কিংশুক জানে না । পোশাক আশাক, টি ভি, রেডিও, মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ফেসবুক, মোটরবাইক, গাড়ি নেই ; থাকার সুপ্ত বাসনা আছে কিনা কে জানে । তাদের নাটক নেই, সিনেমা নেই, বই - পত্তর নেই, দর্শন নেই, অর্থনীতি নেই,-। গপ্পো, কবিতা, সাহিত্য থাকলেও থাকতে পারে । শ্রুতি সাহিত্য । রাত দিন তো বলেই যাচ্ছে । বক বক টক শো । আর গানটা আছেই । সারাদিন খালি এ ডাল ও ডাল উড়ছে, গপ্পো বলছে আর গান গাইছে । খুনসুটি করছে, দু চার কণা খাবার, ফল পাকুড় যখন যা পাচ্ছে ঠুকরে খাচ্ছে । বাঁচার আনন্দেই বেঁচে আছে ।
কিংশুক একজনকে বলেছিল, একটি মেয়েকে, তার কৈশোর যৌবনের সন্ধিক্ষণে । - " আমরা যদি ওরকম পাখি হতে পারতাম! " - কলেজের শেষ ধাপে, তখন ভবিষ্যৎ, চাকরি ইত্যাদির দুশ্চিন্তা, তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে । এক বাগিচার গাছ গাছালির ছায়া পথে হাঁটতে হাঁটতে, পাখ - পাখালি - প্রজাপতিদের অকারণ পূলকে ওড়া উড়ি দেখতে দেখতে, খুনসুটি, গান শুনতে শুনতে, ভবিষ্যৎ চিন্তা কাতর কিংশুক মোহগ্রস্ত গলায় তাকে বলেছিল, " কোন চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, - তুই আমি ওরকম ইচ্ছেসুখে উড়তাম, যেখানে খুশি, যখন খুশি,- । গান গাইতাম, ঝগড়া করতাম,-" একটা দোয়েল আর একটা আহ্লাদী দোয়েলের গলা চুলকে আদর করে দিচ্ছিল । তাকে দেখিয়ে বলেছিল, " ওর মত আমি তোকে,-"
রোমান্টিক আবেগে মোহগ্রস্ত কিংশুক মেয়েটির চোখের দিকে সদর্থক সমর্থন আর উচ্ছ্বাসের আশায় তাকিয়ে থমকে গেছিল । সেখানে না মোহ, না আবেগ উচ্ছ্বাস, সমর্থনের চিহ্ণ । একটা রাগী ভ্রুকুটি । কিংশুক এখনও চোখ বুজলে দেখতে পায়,- তার সুন্দর মুখ থম থম করছিল । সে কিছু না বুঝেই থমকে গেছিল ।
'ছি: ।' - কথাটা তীব্র ধিক্কারে ছিটকে এসেছিল । মেয়েটি তাকে ভীষণই বকুনি দিয়ে বলেছিল, " মানুষের জীবন আর পাখী, পোকা মাকড়ের অর্থহীন জীবন কাটানো এক হলো । তোর কাছে এটা শুনতে হবে আশা করি নি শুক -।'
কিংশুক তক্ষুণি তক্ষুণি বুঝতে পারে নি অন্যায়টা সে কি বলেছিল বকুনি খাবার মতো । কিন্তু ও মেয়ে যখন ভালো তখন খুব ভালো, রাগলে, রাগে ভীষণই কম, - রাগলে ভয়ংকর । সুতরাং বুদ্ধিমানের মত তখন চুপ করে গেছিল । পরদিন দেখা হলে বলেছিল, ' তুই ঠিক বলেছিলি । আমার ভাবনাটাই ভুল ছিল । -' কারণ তখন সে তার ভুলটা ধরতে পেরেছিল । মেয়ের রাগের কারণটাও । এবং মেয়েটির অসাধারণত্ব তাকে অন্য অনেক বারের মত আবারও মুগ্ধ করেছিল । এরকম একটি মেয়ের সঙ্গ লাভের সৌভাগ্যে সে আবার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছিল ।
আশ্চর্য,- মেয়েটি তার সারল্যময়, কিন্তু অদ্ভুত গভীর চোখে তার দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলেছিল, ' কিসের কথা বলছিস বল্ তো,-"
কিংশুক জানত সে মিথ্যে বলছে না । বিষয়টা সে ভুলেই গেছে । মেয়েটা ওরকমই ছিল ।
#########
অজানা এক স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে বসে দিন রাত্রির সন্ধিক্ষণে পাখিদের কুলায় ফেরা দেখতে দেখতে, তাদের কারণ - অকারণ কোলাহল মুখর চঞ্চলতা দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে কিংশুকের সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ছিল ।
পাখিদের জীবনের মত মানুষের জীবন সরলরৈখিক নয় । ওই মেয়েটির তার জীবন সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল । সেও মেয়েটির । হলে ভালো হত না খারাপ সেটা অন্য কথা । কিন্তু বাস্তব হল, সেটা হয় নি । তার দোষ, কিম্বা ভুলেই মেয়েটি একদিন কোথায় যেন ছিটকে গেল । ছিটকে গিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল । অথবা সে ই তাকে হারিয়ে ফেলল । হারিয়ে সে ফেলেছে, এবং হারিয়েছে এক অমূল্য, মহার্ঘ্য রত্ন, এটা বুঝতে বুঝতে তার এতটাই সময় চলে গেল, যে তাকে আবার খুঁজে বের করতে পারার সম্ভাবনাটা ও নষ্ট হয়ে গেল ।
ভুল হল । গেছিল । হঠাৎই এতদিন পরে সে আবার তার মহার্ঘ্য রত্নের সন্ধান পেয়ে গেছিল গতকাল সকালে,- । কি ভাবে, অত বিস্তারিত ব্যাখ্যার দরকার নেই । অফিসে নতুন আলাপ, বন্ধুর বন্ধু, তার বন্ধু,- তার সূত্রে নাম আর ঠিকানা, তা ও সম্ভবতঃ,- কিন্তু কিংশুকের আর দেরী করার সময় ছিল না । হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে পাঁচ/ছ ঘণ্টা ।
কিংশুক বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছিল রাতে সে ফিরতে পারে, নাও পারে । ট্যুরে যাচ্ছে । এরকম অফিসের কাজে তাকে মাঝে মধ্যে যেতেই হয় । তাই হঠাৎ, কিম্বা আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না ।
বিকেল সাড়ে তিনটে বাজতেই সে বেরিয়ে এসেছিল।
টিকিট কাউন্টারে স্টেশনের নাম বলতে বুকিং ক্লার্ক বলেছিলেন, ' এক্সপ্রেসের টিকিট দিলাম ।' - স্বাভাবিক । ট্রেনটা খুব বেশি না হলেও কিঞ্চিৎ দুর পাল্লায় পাড়ি তো দেয় ই ।
প্ল্যাটফর্মে ঢোকার আগে এক চায়ের দোকানে স্টেশনের নাম করে ট্রেনের খোঁজ করতেই দোকানদার বলেছিল, ' ওই যে, তিন নম্বরে । তাড়াতাড়ি যান । এক্ষুনি ছেড়ে দেবে, - ।'
প্রায় দৌড়েই একটা কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়েছিল কিংশুক । আর ট্রেনটা ছেড়ে দিয়েছিল । একদমই ভীড় ছিল না কামরায় । এক তিন সিটের বেঞ্চে সে আর এক ভদ্রলোক । সামনেরটায় এক প্রৌঢ়, এক অবিবাহিতা তরুণী, সম্ভবতঃ কন্যা, একটি ছেলে, ভাই টাই হবে ।
জানলার ধার তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন ভদ্রলোক । অনেকেই সরাসরি হওয়া, ধুলোবালি পছন্দ করে না । সেখানে আরাম করে বসে কিংশুক অভ্যেস বশত: মোবাইল সন্ধানে পকেটে হাত দিয়ে বুঝলো সেটা অফিস ড্রয়ারেই ফেলে এসেছে । মুহূর্তে একটু শূন্য শূন্য লাগা । অভ্যেস । কি আর করার । অ্যাটাচি খুলে একটা গল্পের বই বার করেছিল । তার অ্যাটাচিতে সব সময়েই দু চারটে বই থাকে । - অমৃত কুম্ভের সন্ধানে ।
ট্রেনটা প্রথমে আস্তে, তারপর গতি বাড়িয়ে দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল । সহর ছাড়ছিল তারা । ঠাণ্ডা, মিষ্টি হওয়া আসছিল । যত সময় যাচ্ছিল তার ধার বাড়ছিল । মুশকিল হল, দ্রুতগামী ট্রেনের জানলা দিয়ে আসা হেমন্তের এই বাতাস একটু পরেই সহ্য সীমা ছাড়াতে থাকবে, অথচ তখন মন না চাইবে তাকে ছাড়তে, শরীর না পারবে সহ্য করতে । কিন্তু সে পরের ব্যাপার ।
বই কোলে সে ক্রমশঃ অপসৃয়মান সহর দেখছিল অন্য মনস্ক হয়ে । কতদিন পরে, কত যুগ পরে তার সঙ্গে দেখা হবে । সেই দেখাটা কেমন হবে ! সূত্রের অসমর্থিত খবর, সে একাই আছে । একই রকম কি ? তাকে এখন কিংশুকের জিজ্ঞাসা করার আছে, - এখনও কি সে মনে করে এই অনর্থক ভারবাহী, অনর্থক সব সমস্যা দীর্ণ, ঘাত প্রতিঘাত ময় , নিয়ত সংগ্রাম ক্লিষ্ট, বন্দী মনুষ্য জীবন, ওই ভারহীন, মুক্ত পাখির জীবনের থেকে কাম্য ? ভালো ?
জানলা থেকে চোখ সরিয়ে ভেতরে আনতেই কিংশুকের চোখে পড়েছিল এক জোড়া আয়ত কালো চোখ তার দিকে তাকিয়ে । চোখে চোখ পড়তেই যারা নেমে গিয়েছিল । আর কিংশুক শুরু করেছিল অমৃত কুম্ভের সন্ধান ।
########
অমৃত কুম্ভ যাত্রী কিংশুক এতই মগ্ন ছিল, কতটা সময় চলে গেছে বুঝতে পারে নি । তাকে দেওয়া সময় অনুযায়ী নিশ্চিন্তেই ঘণ্টা চারেক পরে সে তার স্টেশনের সন্ধানে বাইরে চোখ রাখতে পারে । অনেকটাই সময় । সুতরাং মাঝে মধ্যে ঘড়িতে চোখ বোলানো ছাড়া কুম্ভ যাত্রা থেকে নজর বা মনোযোগ সরানোর প্রয়োজন বোধ করে নি ।
ইতি মধ্যে অন্ধকার নেমেছিল । কামরায় আলো জ্বলেছিল । কোন কোন স্টেশনে ট্রেন থেমেছে, আবার ছেড়েছে । তার মনোযোগ ভেঙ্গেছিল পাশের ভদ্রলোকের কুণ্ঠিত অনুরোধে, ' জানলাটা এবার বন্ধ করে দিলে হয় না ! বেশ ঠাণ্ডা আসছে । এই হাওয়াটা ভালো না,- ।'
ঠিকই । সব হাওয়া স্বাস্থ্যকর নয় কাঁচের জানলাটা নামিয়ে বাইরের অন্ধকার জগতে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে কিংশুক ঘড়ির কাঁটা দেখেছিল ।- সাতটা । তিন ঘণ্টা হয়ে গেল ।
অমৃত কুম্ভ যাত্রা পথের দুই পৃষ্ঠার মাঝে পকেট থেকে একটা কিসের যেন বিল বুক মার্ক হিসেবে দিয়ে সে বইটা কলের ওপর রেখে শূন্য দৃষ্টিতে জানলার কাঁচের মধ্যে দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল । সেই মেয়েটির কথা ভাবছিল ? ভাবা স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু সে আসলে কিছুই ভাবছিল না ।
হঠাৎই তার অন্যমনস্কতা ভাঙিয়ে মেয়েলী কণ্ঠ বলেছিল দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে, ' বইটা একটু দেখব? - '
সামনের সিটের মেয়েটি । কিংশুক ব্যস্ত হয়ে বলেছিল, " নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, - '
বইটা হাতে নিয়ে মেয়েটি সসংকোচে প্রশ্ন করেছিল, ' আপনি কতদূর যাবেন, -? ' স্বাভাবিক । সে ভেবে, সেভাবেই তো বইটা পড়তে হবে ।
কিংশুক তার স্টেশনের নাম বলেছিল । আর অদ্ভুত ভাবে সেই নামটা শুনে শুধু মেয়েটিই নয়, কামরায় তার আশ পাশের সবাই কেমন যেন থমকে গিয়েছিল ।আর অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল তার মুখের দিকে ।
##########
কয়েক মুহূর্তের ধাক্কা সামলে সবাই প্রায় এক সঙ্গে বলে উঠেছিল, ' এ ট্রেনটা তো ওই স্টেশনে থামে না, - ।- সব এক্সপ্রেসের ওটাতে স্টপেজ নেই । - '
এবার ধাক্কাটা কিংশুকের । সেটা সামলে তার পাংশু মুখ থেকে বোকার মত প্রশ্নটা বেরিয়ে এসেছিল, ' তাহলে -? '
সত্যি তো! তাহলে ? এসব ক্ষেত্রে যা হয়, পার্শ্ববর্তী সব মানুষই নিজেকে অসহায় মানুষটার জায়গায় বসিয়ে তার সমস্যাটাকে নিজের বলে ভাবতে শুরু করে আর সেই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক চেষ্টা শুরু করে ।
কিংশুকই সমস্যার সোজা সমাধান খুঁজে দ্রুত উঠে পড়েছিল, ' আমি তাহলে সামনের কোন স্টেশনে নেমে যাই, যেখানে দাঁড়াবে সেখান থেকে লোক্যাল প্যাসেঞ্জার ধরে, - '
মেয়েটির বাবা তাকে হতাশ করে মাথা নেড়ে ছিল , 'সে হবে না । এই এক্সপ্রেস এখন আর কাছাকাছি কোন স্টেশনে দাঁড়াবে না । প্রায় দেড় ঘণ্টা পরের জংশন নেক্সট স্টপেজ ।- - '
' তাহলে? ' - কিংশুক আবার অসহায় ভাবে বসে পড়েছিল ।
মেয়েটাই সমাধান করে দিয়েছিল । আপাত: সমাধান । ওই জংশনেই নেমে ফিরতি কোন প্যাসেঞ্জার ধরে উজিয়ে এসে কিংশুকের স্টেশনে নামা । একটু বেশি দেরী হবে, এই যা । - সমস্যার সরল সমাধান করে মেয়েটি নিশ্চিন্তে আবার অমৃত কুম্ভ সন্ধানে পাড়ি দিয়েছিল । অগত্যা কিংশুক আবার বাইরে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছিল ।
জংশন স্টেশন আসার আগে থেকেই সবাই ব্যস্ত হয়ে তাকে সতর্ক করে দিতে শুরু করেছিল । কিংশুকের সঙ্গে শুধু ওই অ্যাটাচি টাই । সেটা হাতে নিয়ে সে দরজার দিকে এগোতে মেয়েটা বইটা বন্ধ করে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, ' আপনার বইটা, -।'
কিংশুক একটু দাঁড়িয়ে বলেছিল, ' আমার পড়া হয়ে গেছে । ওটা আপনার কাছেই থাক - ।'
মেয়েটি কোন কথা না বলে নিশ্চিন্ত হয়ে আবার বইটা খুলে বসেছিল তার দিকে না তাকিয়েই ।
####₹#
যে স্টেশনটায় অতঃপর তাকে নামতে হয়েছিল সেটাও একটা জংশন, আর সেটাও বেশ বড়সড় ই ছিল । গোটা চার প্ল্যাটফর্ম । রাত দশটা তেও বেশ লোকজন, খোলা দোকানপাট । এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে সে ওভার ব্রীজ পেরিয়ে চার নম্বর থেকে দু নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে বসেছিল শেডের নীচে এরকমই একটা বেঞ্চে । সারাদিনের ক্লান্তি । ঝিমুনি এসে গিয়েছিল । হঠাৎই যান্ত্রিক স্বরে জড়ানো মড়ানো কিছু দুর্বোধ্য ঘোষণা, লোকজনের হৈ চৈ তে চটকা ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতেই ট্রেনটা হুড়মুড় করে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়েছিল ।
তাড়াতাড়ি ব্রিফ কেস হাতে আগে একটু এগিয়ে গিয়ে একটা কামরার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে । বেশ লোকজন নামে এই স্টেশনে । তারা সবাই নামতে না নামতেই ট্রেনের সিটি বেজে গেছিল, হুড়মুড়িয়ে উঠতে গিয়ে কিংশুক প্রায় পড়ে যেতে যেতে হ্যান্ডেলটা ধরে কোনমতে সামলে নিয়েছিল । ভেতর থেকে একটা আতংক মিশ্রিত 'গেল, গেল ' চীৎকার কানে এসেছিল তার ।
দরজার ধারে একটু দাঁড়িয়ে নি: শ্বাস নিয়ে কিংশুক
আস্তে আস্তে কামরার ভেতরে এগিয়ে গেছিল অতঃপর ।
ট্রেনে সাংঘাতিক কিছু ভিড় না থাকলেও বসার কোন জায়গা ছিল না । সামনের একটা ওপরের বাংকে অ্যাটাচিটা রেখে সামনে হ্যান্ডেল ধরে কিংশুক দাঁড়িয়ে গেছিল প্যাসেজে ।
বামা কণ্ঠে একটা তীব্র ভৎসনা ভেসে এলো,' ওরকম তাড়াহুড়ো করেন কেন ? একটু সাবধানে ট্রেনে বাসে ওঠানামা করতে হয় জানেন না ! যাচ্ছিলেন তো এক্ষুণি ট্রেনের নীচে চলে ।- '
আর একটি বামা কণ্ঠ হুল ফোটাল,' আপনি যেতেন যেতেন ! আমাদেরও ফাঁসিয়ে যেতেন । এমনিতেই ট্রেনটা যা লেট করছে, এগারোটা কেন, বারোটা তেও বাড়ি পৌঁছলে হয় । আপনি ট্রেনের নীচে গেলে আজ বাড়িতে পৌঁছনোরই তেরোটা বেজে যেত, - '
একটা তরুণ কণ্ঠ কিংশুকের সমর্থনে এগিয়ে এলো, ' তোরা এমন ভাবে বলছিস যেন উনি ইচ্ছে করে মরবো বলে ঝাঁপ দিয়েছিলেন - '
আর একটি তরুণ কণ্ঠ, 'আর অ্যাকসিডেন্ট অ্যাকসিডেন্ট । না চাইলেও হয়ে যায় । যত সাবধানে থাকো না কেন ! '
আলোচনা অ্যাকসিডেন্টে ঘুরে গেল ।- ' আরে বাবা, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকেই পিষে দিচ্ছে গাড়ি - '
সম্ভবতঃ এই তরুণ দলটি এক সঙ্গে এসময় কোন কাজ থেকে ফেরে । অথবা কোথাও থেকে ফিরছিল দল বেঁধে । তাদের কিচির মিচির শুনতে খারাপ লাগছিল না ।
ট্রেনটা দ্রুত গতিতে একটার পর একটা স্টেশন পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল । এমনিতে বোঝা যাচ্ছিল না । শুধু স্টেশনে থামলেই খেয়াল হচ্ছিল । যদিও ওই জংশনের পর নামা ওঠাও আর বিশেষ ছিল না । কদাচিৎ একজন দুজন । প্রথম বামা কণ্ঠ, যে তাকে ঝাঁঝিয়ে ছিল তার পাশ থেকে সেরকম এক জন উঠে যেতেই আরো একটু সরে বসে তাকে বলল, ' অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন । বসুন, বসুন ।- '
একটি ছেলে নিরীহ গলায় বলল, ' একদম । এখানে স্লিপ করলেও কোন ভয় নেই । মৌ ভালো লাইফ সেভার, - ।'
কিংশুক বসতে বসতে ওদের জিজ্ঞাসা করেছিল তার স্টেশনের নাম করে, ' আর কতদূর বলতে পারেন ? আমাকে একটু নামিয়ে দেবেন কাইন্ডলি,- '
আবারও সব থমকে গেছিল । কিছুক্ষণ বিশ্রী নীরবতা । তারপর মেয়েটিই প্রথম বলেছিল, ' আপনি তো সম্পূর্ণ উল্টো দিকের অন্য লাইনের ট্রেন ধরেছেন । এই ট্রেন কখনোই ওই স্টেশনে যাবে না । '
########
অতঃপর ! তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা । কিংশুক সামনের স্টেশনেই নেমে যেতে ছেয়েছিল ফিরতি ট্রেন ধরার জন্যে । ওরা নামতে দিল না । - ' এখানে নামার কোন মনে হয় না । এটা সিঙ্গল লাইন । রাতে আর কোন ট্রেন ফিরবে না এই লাইনে । কাল ভোরে এই ট্রেনটাই ফিরবে ফাস্ট ট্রেন হয়ে । তার থেকে এটা যে পর্যন্ত যাবে, সেই জংশন স্টেশনে চলে যাওয়াই ভালো । - '
একটি ছেলে ভেবেচিন্তে বলেছিল, ' যদি আজ রাতেই, মানে রাত তো হয়েইছে, ভোর ভোরও যদি আপনার স্টেশনে পৌঁছতে চান ওখান থেকেই আর একটা জংশনে যাওয়া যায়, ট্রেন থাকাও সম্ভব, - সেই জংশনটা বড়ো, কপাল ভালো থাকলে সেখান থেকে মাঝ রাতেও আপনার স্টেশনে যাবার কোন ট্রেন পাওয়া যেতে পারে -। অনেক ট্রেন আপনার স্টেশনে যায় ওখান দিয়ে -।'
মিষ্টি মেয়েটা জিজ্ঞেস করেছিল, ' আপনার বাড়ি ওখানে ? '
সে বলেছিল, ' না, বন্ধুর বাড়ি ।' - বান্ধবীটা কেন জানি আটকে গেল মুখে ।
তাই ঠিক হয়েছিল । ওরাও সবাই ওখানে নেমেছিল । সঙ্গে সঙ্গে চলে না গিয়ে একটি ছেলে স্টেশনের অফিস থেকে খবর নিয়ে এসে উজ্জ্বল মুখে বলেছিল, ' আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওই জংশনে যাবার একটা ট্রেন আসছে । '
মিষ্টি মুখ মেয়েটি বলেছিল, ' আপনি কিন্তু চাইলে আজ রাতটা আমাদের যে কোন কারুর বাড়িতে কাটিয়ে ভোরে ট্রেন ধরতে পারেন । '
সে আন্তরিক ভাবে তাদের ধন্যবাদ দিয়ে বলেছিল বন্ধু খুব চিন্তা করছে ।
তারা জোর করে নি, কিন্তু তাকে ট্রেনে তুলে বসিয়ে দিয়ে তাকে ' টা, টা ' করে সাবধানে যাবার বারংবার পরামর্শ দিয়ে কিচির মিচির করতে করতে ট্রেন ছাড়া না পর্যন্ত দাঁড়িয়ে তাকে বিদায় দিয়েছিল ।
#########
পরের ব্যাপারটা ঠিকই ছিল । ঘন্টা দেড়েক পর সে সেই জংশনে পৌঁছেছিল । সঙ্গে সঙ্গে না হলেও খোঁজ নিয়ে জেনে ছিল ভোর চারটে নাগাদ তার গন্তব্যের স্টেশনের ট্রেন এখন থেকেই ছাড়বে । ট্রেনটা দাঁড়িয়েই ছিল স্টেশনে ।
এবারে সে একেবারে আঁট ঘাট বেঁধেই নিয়েছিল জংশনে জংশনে ভুলভাল আর ঘুরতে যাতে না হয় । সব থেকে বড় কথা, সে একটা টিকিটও কেটে নিয়েছিল তার গন্তব্যের । তখন সে তো বিনা টিকিটের যাত্রী । কাউন্টারে খুঁটি নাটি জেনে নিয়েছিল, কথা ঘণ্টা দেড়েক লাগবে তার গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছতে । মাঝে দু চারটে জংশন পড়বে, তাতে তার কিছু এসে যায় না । তার গন্তব্যের আগের দুটো স্টেশনের নামও সে জেনে নিয়েছিল । যাতে আগে থাকতে তৈরী থাকতে পারে । তারপর নিশ্চিন্তে ট্রেনে গিয়ে উঠেছিল । দিক ভ্রম হওয়ার প্রশ্ন ছিল না । একটাই ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে । এবং বুকিং ক্লার্ক বলে দিয়েছিল এটাই তার গন্তব্যের ট্রেন ।
আরও নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে সে কোন সহ যাত্রীকে বলে রাখবে ঠিক করেছিল তার গন্তব্য আসার আগে তাকে বলে দিতে । কিন্তু গোটা ট্রেনটাই এখন প্রায় ফাঁকা । তার মধ্যে দু চারজন আছে এরকম একটা কামরায় উঠে আর এক জানলায় বসে থাকা একটি লোককে তার স্টেশনের নাম বলে অনুরোধ করেছিল, ' ভাই, আমাকে একটু বলে দেবেন স্টেশনটা আসার আগে, - । '
সে একটু অপরাধী গলায় বলেছিল, ' আমি তো ওর অনেক আগেই নেমে যাব । ঠিক আছে, আর কেউ উঠলে যারা আরও দূরে যাবে তাদের কাউকে বলে দেব ।- '
কামরায় আরও তিনজন লোক একই কথা বলেছিল । মোটামুটি এবার সে নিশ্চিন্তই হয়েছিল সে তার গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে ঠিকঠাক ।
হয় নি । আবারও গন্ডগোল হয়ে গেল ।
#########
সারাদিনের পরিশ্রম, যাত্রার ধকল, দু :শ্চিন্তা, সঙ্গে সঙ্গত করছিল অনুকূল আবহাওয়া, পরিবেশ, - একটু নিশ্চয়তার আশ্বাস পেতেই তার শরীর ছেড়ে দিল । কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে গভীর ঘুমের জগতে তলিয়ে গিয়েছিল ।
ঘুম যখন ভেঙ্গেছিল, তখন চারদিকে উজ্জ্বল দিনের আলো ঝলকাছে । সে শান্ত নীরবতা কখন বদলে গেছে কোলাহলে । ঘুমের মাঝে ' চা - য়, চা - য়, ' শুনেছিল, ঘুমের মধ্যেই খেয়েওছিল, - কিন্তু এত বেলা, - সে কোথায় ?
উদ্বিগ্ন হয়ে আশ পাশে তাকিয়েছিল । অচেনা সব মানুষ । করিডরে ও মানুষের ভীড় । জীবন সংগ্রামে অভিযান শুরু হয়ে গেছে বোঝা যাচ্ছিল । তাড়াতাড়ি ঘড়িতে চোখ রেখেছিল । প্রায় সাড়ে দশটা । পাশের লোকটাকে ব্যস্ত হয়ে তার স্টেশনের নাম বলে শংকিত গলায় প্রশ্ন করেছিল, ' ভাই, স্টেশনটা আর কতদূরে ? - '
লোকটা আঁতকে উঠে আপাদমস্তক তাকে দেখেছিল । তারপর বলেছিল, ' সে স্টেশন এদিকে কোথায় -? '
আর একজন মুচকি হেসে বলেছিল, ' আপনি যখন স্বপ্ন দেখছিলেন তখন এ ট্রেন আপনাকে নিয়ে অন্য দেশে চলে এসেছে । কোথায়, কখন, কবে চলে গেছে আপনার স্টেশন ! আপনি এখন আপনার রাজ্যেই নেই - ।….'
###########
আবার, আবারও, - । কিংশুক বোকার মত একঝাঁক সহানুভূতি আর করুণা মিশ্রিত দৃষ্টির মধ্যে দিয়ে নেমে গেছিল পরের স্টেশনে । এটাও একটা বড়ো জংশন স্টেশন ।
সম্ভবতঃ সে যাদের বলে রেখেছিল তারা এদের কাউকে তার নামার ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিতে ভুলে গেছিল । অথবা এরা কেউই তাদের নেমে যাওয়ার আগে ওঠেনি । সেটাই সম্ভব । কারণ স্টেশনে নেমে সে যে তথ্য আহরণ করলো এ যাত্রা তার প্রায় অগস্ত্য যাত্রাই হয়ে গেছে । সে যে এখন থেকে এক্ষুণি আবার সরাসরি ফিরতি কোন ট্রেনে ফিরবে ত হওয়ার উপায় নেই । মেন লাইন, কর্ড লাইন, আবার মেন লাইনে ওঠা নামা করে এই ট্রেনটা অনেকরকম জংশন স্টেশন ছুঁয়ে জিগ জ্যাগ পদ্ধতিতে যাতায়াত করে । দিনে এরকম একটাই ট্রেন এভাবে এপথে আসে যায় । এ ট্রেন আবার ফিরবে রাতে । ঘুমন্ত কিংশুককে নিয়ে সে তার এদিকের দীর্ঘ কিন্তু নির্দিষ্ট সফর শেষ করে গিয়েছে । তখুনি ফিরতে তাকে আবার আরও কতগুলো ভায়া জংশন ট্রেন বদলে ফিরতে হবে । নাহলে সেই রাত ।
অতঃপর । অতঃপর স্টেশনের একটা দোকানে সে পেট ভরে পুরি - তরকারি খেয়েছিল । গরম চা । দীর্ঘ ঘুম আর পেট ভরা খাবারে আশ্চর্য, হঠাৎই তার সমস্ত চিন্তা, দু :শ্চিন্তা কোথায় মিলিয়ে গিয়ে মাথাটা দিব্যি হালকা লাগতে শুরু করেছিল । বলতে নেই, হঠাৎই তার খুব ভালো লাগতে শুরু করেছিল । গোটা ব্যাপারটা সে অজান্তেই সম্ভবতঃ উপভোগ করতে আরম্ভ করেছিল ।
আরও একটু শেডের তলায় একটা বেঞ্চে বসে থেকে সে সোজা স্টেশন মাস্টারের ঘরে ঢুকে বিপন্ন গলায় বলেছিল, ' আমাকে একটু সাহায্য করবেন? খুব বিপদে পড়ে গেছি । এখন বোধহয় আমি ডাবলু টি ও হয়ে গেছি-। '
তাকে দেখে কি মনে হয়েছিল, ভদ্রলোক বসতে বলে খুঁটিয়ে সব শুনে সহানুভূতির গলায় বলেছিলেন, ' ডাবলু টি ' র কথা ছাড়ুন । ওটা কোন ব্যাপার নয় । কিন্তু আপনার দুর্দশার কথা শুনে আমারই খুব খারাপ লাগছে । তবে ভুল তো, - হয়েই যায় -! চিন্তার কিছু নেই । আমি আপনাকে আর একটা টিকিট করিয়ে দিচ্ছি আপনাকে গোটা চারেক ভায়া জংশন ট্রেন বদলাতে হবে । সে চারটে টিকিটের পেছনে লিখে দিচ্ছি । এবারে স্টেশনগুলো খেয়াল রাখবেন । ঘন্টা দুয়ে কে পৌঁছে যাবেন ।- ট্রেনে ওঠার সময় দিকটা ঠিক রাখবেন । এসব দুমুখো জংশনে দিকভ্রমটা খুবই হয়ে যায় । সব সময় কাউকে জিজ্ঞেস করে উঠবেন । আসলে বুঝলেন তো,-' ভদ্রলোক হেসে বলেছিলেন, ' এদেশের প্রায় সবটাই মাকড়সার জালের মত ট্রেন লাইনের জালে জড়ানো । অসংখ্য জংশনে পুরো জালটাই জোড়া । আর গোটা জল জুড়ে গাদা গাদা ট্রেন ছুটছে । যে কোন জংশন থেকে যে কোন জংশনে যাওয়া যায় । জংশনে জংশনে আপনার ট্রেন পাল্টাতে হতে পারে । কিন্তু গন্তব্য স্টেশন জানা থাকলে, দিক ঠিক থাকলে, ঠিক ঠিক ট্রেনে উঠলে আপনি আপনার গন্তব্যে পৌঁছবেন না হতেই পারে না । হ্যাঁ, সময় লাগতে পারে, বেশী - কম, ব্যাস - এই পর্য্যন্ত । আসুন চা খান । তিন নাম্বার থেকে আপনার ট্রেন ছাড়বে আপাতত: পনের মিনিট পর । দক্ষিণ মুখো ।- তারপর কোথায় নামবেন টিকিটের পেছনে লিখে দিচ্ছি দেখে নেবেন । জিজ্ঞেস করে সেখান থেকে ট্রেনে উঠবেন ।- '
##########
কিংশুক অক্ষরে অক্ষরে তাঁর নির্দেশ পালন করেছিল । নিজের দিক জ্ঞান সম্পর্কে নিজেরই আস্থা না থাকায় সে একজনকে জিজ্ঞেস করে ট্রেনে উঠেছিল । যখন তখন নামতে হবে বলে দরজার ঠিক পরেই জানলার ধারে একটা জায়গা দখল করে বসেছিল । সম্ভবতঃ ভারমুক্ত বলেই তখন সে জানলার বাইরে প্রকৃতি উপভোগ করতে পারছিল । আর স্টেশনের নাম খেয়াল রাখছিল । এবারে ঠিকঠাক সে তার মেয়েটির কাছে পৌঁছে যাবে, তার গন্তব্যে । ভেবে কি তার নিশ্চিন্ত লাগছিল, আনন্দ হচ্ছিল, - কে জানে,- তবে এ যাত্রা তার জন্যে যে অনেক মজা আর অদ্ভুত ব্যাপার অপেক্ষা করে ছিল সেটা খুব সত্যি ! -
তার সামনের সিটে একটি মেয়ে বসেছিল । একটি পুরুষ একটি মেয়ের উপস্থিতিতে - আর একটি মেয়ে পুরুষটির উপস্থিতিতে - অপ্রয়োজনে, অজান্তেই একটু বাড়তি সচেতন থাকবে আশ্চর্যের নয় ।- এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই তাই হয়েছিল । বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সে অনুভব করছিল মেয়েটি উসখুশ করছে, মুখে চোখে একটা চাপা উত্তেজনা, উদ্বেগের ছাপ । দুটো স্টেশন পেরিয়ে যাবার পর মেয়েটি হঠাৎই তাকে একটা স্টেশনের নাম করে প্রশ্ন করেছিল, ' আচ্ছা, স্টেশনটা আসতে আর কতক্ষণ লাগবে বলতে পারেন? আসার আগে কাইন্ডলি আমাকে একটু বলে দেবেন, -? '
কে কাকে স্টেশন চিনিয়ে দিতে বলছে ! অলক্ষ্যে কেউ কি ফিচেল হাসি হাসছিল ?
থতমত ভাবটা কাটিয়ে কিংশুক বলতে পেরেছিল, ' মানে, আসলে, - আমি এদিকে একদম নতুন । কোন স্টেশনই চিনি না, -।'
মেয়েটির মুখ ম্লান এবং আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল । কিংশুকের খুবই খারাপ লাগছিল । হঠাৎই পাশে বসা একটি যুবক বলে উঠেছিল, ' ভাববেন না, আমি ওই স্টেশনেই নামবো । আপনাকে নামিয়ে দেব,-।'
মেয়েটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল ।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করেছিল,'আপনি কোথায় যাবেন ?'
মেয়েটি একটি পাড়ার নাম করেছিল ।
ছেলেটি উজ্জ্বল মুখে বলেছিল, ' আরে, আমিও তো ওই পাড়ায় থাকি । কার বাড়ি যাবেন ?'
এর পর তারা দুজন উজ্বল মুখে গল্প করতে থাকলো । গন্তব্য স্টেশন আসতে দুজনেই নেমে গেল ।
কিংশুকের সন্দেহবাতিকগ্রস্থ মনটা খচ খচ করতে শুরু করেছিল । ছেলেটার কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই তো ?
নিশ্চয়ই না ছেলেটার মুখ ত বলছিল না । কিংশুক নিজেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিল । এবং স্টেশনের নাম পড়ায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতে শুরু করেছিল । তাকে তো নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই !
এত আঁট ঘাট বেঁধে, স্টেশন মাস্টার ভদ্রলোকের নিখুঁত নির্দেশিকা করে দেওয়ার পর কিংশুকের তার গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছনোয় আর কোন ভুল হওয়া উচিত ছিল না । ভুল হচ্ছিলও না । আবার হয়েও গেল । হল, কারণ সেটা ওই নির্দেশিকায় ছিল না । থাকা সম্ভব ও ছিল না । কিন্তু তার জন্যেই আবার একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল কিংশুকের । যদিও কিংশুককে তার জন্যে দায়ী করা যায় না নিশ্চয়ই ।
ভুলটা এবার অবশ্য অত মারাত্মক ছিল না । কিংশুক ট্রেনের বাঁদিকের জানলায় বসেছিল । প্ল্যাটফর্ম গুলো এদিকেই পড়ছিল । না পড়লেও লাইনের ওদিকে অন্য প্ল্যাটফর্ম থাকছিল । সুতরাং স্টেশনের নাম দেওয়া বোর্ড দেখতে তার অসুবিধে হচ্ছিল না । হঠাৎ একটা স্টেশন এসেছিল যেখানে বাঁদিকে কোনোই প্ল্যাটফর্ম ছিলো না । শুধু কিছু গাছপালা, বাড়ি ঘর দোর -। এমনকি, ট্রেনটা যে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়েছে, সিগন্যালে নয়, সেটা যখন তার বোধ হয়েছিল তখন সেটা ছেড়েও দিয়েছে । প্রথমে অতটা গুরুত্ব দেয় নি চলে যাওয়া স্টেশন নিয়ে, কিন্তু ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে কেন, ভাবলেও ভয় । সুতরাং কিঞ্চিৎ উসখুশ করে পাশের লোকটাকে জিজ্ঞেসই করে ফেলেছিল, ' দাদা, কোন স্টেশন গেল ? '
লোকটা যে স্টেশনের নাম করল, অবধারিত ভাবে সেই স্টেশনটাই তার নেমে ট্রেন বদলানোর জন্যে নির্দিষ্ট অন্যতম একটা জংশন স্টেশনই ছিল, ছোট হলেও ।
##########
যাকগে, - খুব একটা অসুবিধে হয় নি এ যাত্রা তার আর একটা অচেনা স্টেশনে ঘন্টাখানেক বসে থাকতে হয়েছিল আর একবার, - অচেনা লোকজন, যাত্রী, দোকান, পরিবেশের মধ্যে,- এই পর্যন্ত । খারাপ লাগছিল না । ফিরতি এক ট্রেনে ফেলে যাওয়া নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছেছিল আবার সেখানে আরও ঘন্টাখানেক সেই স্টেশনের অপরিচিত পরিবেশে কাটিয়ে আবার তার মূল গন্তব্যের পরবর্তী ট্রেন ধরেছিল ।
আর কোন ভুল হয় নি । সন্ধ্যের মুখে পৌঁছেছিল এখন সে যেখানে বসে আছে সেই স্টেশনে । আর মাত্র একবার, তারপর আর নামা নামি, ট্রেন বদলানো নেই । আর একটা ট্রেনেই ওঠা এবং নামা আছে । ট্রেনটা আসার অপেক্ষা শুধু এখন । এই ট্রেনে উঠলেই আর আধ ঘণ্টা, পঁয় তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে সে পৌঁছে যাবে তার গন্তব্য স্টেশনে । সেখান থেকে বেরিয়ে খুঁজে বের করা তার শেষ কৈশোরের হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বান্ধবীকে । ব্যাস, -।
তা - ও, এবারেও সে আর কোন ঝুঁকি নেয় নি । এই বিশাল মাকড়সার জালের যে কোন প্রান্তে, যে কোন এক বিন্দুতে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে জালের যে কোন বিন্দুতেই নিশ্চিন্তে পৌঁছনো যায়, হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থেকেই যায় । সে সম্ভাবনা রুখতে ঠিকঠাক গন্তব্য জানার সঙ্গে সঙ্গে জানা জরুরী সঠিক দিক, সঠিক প্ল্যাটফর্ম, সঠিক ট্রেন, সেই ট্রেন সেই গন্তব্যে দাঁড়ায় কিনা, ইত্যাদি । এর একটাতেও ভুল হলে কিংশুকের এখনকার অবস্থায় পড়তে হতে পারে । যাক গে, এবারে স্টেশন অফিসে গিয়ে কিংশুক খুঁটিয়ে সব খোঁজ নিয়ে এসে বসে ছিল । এমনকি এবারে স্টেশনটা কোন দিকে পড়বে, তার আগের দুটো স্টেশনের নামও সে জেনে এসেছে । আর ভুল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই ।
##########
স্টেশনের পাবলিক অ্যাড্রেসে যথারীতি জড়ানো যান্ত্রিক স্বরে কোনো ট্রেন ঢোকার ঘোষণা শুরু হল । কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্রেনকে ঊর্ধ্বশ্বাসে স্টেশনে ঢুকে আস্তে আস্তে গতি কমিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেল । ট্রেনটা এই প্ল্যাটফর্মে ই ঢুকছিল । ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কতিপয় যাত্রীদের ব্যস্ততা শুরু হল ।
কিংশুকও তার বেঞ্চ ছেড়ে উঠে এসেছিল । আস্তে আস্তে কি যেন ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাচ্ছিল প্রায় থামার মুখে ট্রেনটার দিকে ।
কিন্তু আশ্চর্য, - কিংশুক এই ট্রেনটার দিকে কেন এগিয়ে যাচ্ছে ? ও তো এবারে সমস্ত খোঁজ খবর নিয়েই এসেছে । ওর তো জানা উচিত এই ট্রেনটা ওর ট্রেন নয় । এই ট্রেন তো ওর বান্ধবীর কাছে ওর গন্তব্য স্টেশনে যাবে না ! ও কি শেষ পর্য্যন্ত কলকাতায়, ওর বাড়িতে ফিরে যাওয়া ঠিক করেছে ? কিন্তু ও তো জানে এখন, এই ট্রেন সেদিকেও যাবে না ! এই ট্রেন তো একটু পরেই ঘুরে একদম অন্যদিকে চলে যাবে ।
কিংশুক, কিংশুক, কি করছো ? আবার ভুল দিকে যাচ্ছ ?
কিংশুক, কিংশুক, - শোন - । ভুল করছ আবার! শোন, - ওটা তোমার ট্রেন নয় !
যা: ! ও যে ট্রেনে উঠে পড়লো । আরে, ট্রেনটা ছেড়েও দিল । কিংশুক, - । কিংশুক ! - আশ্চর্য !

0 মন্তব্য
প্রদর্শন
আড়াল