গল্প
উদ্ভিদ
অনিন্দিতা গোস্বামী
মাটি ফুঁড়ে উঠেছ । লিকপিক করছে দুটি সবুজ পাতা সহ এতোটুকু অংকুর । রমাকান্তের চোখ গেল বাগানের দক্ষিণ কোণে । ঝুঁকে পড়লেন । তাই তো ! এ গাছ তো তিনি খেয়াল করেন নি আগে । নাহ,চিনতে পারছেন না । অচেনা গাছ, তিনি লাগান নি, তবে কি গজা লাগালো ? জিজ্ঞাসা করতে হবে । তার অচেনা গাছ এই অঞ্চলে নেই বিশেষ, তিনি বহু গাছগাছালি চেনেন । এমনকি আগাছাও । কিন্তু এ গাছ আগাছা বলে উপড়ে ফেলার মত নয়, এর বেড়ে ওঠার মধ্যে কেমন যেন একটা স্পর্ধা আছে । সজীব, চকচকে । চিন্তান্বিত হয়ে তিনি বাগানের অন্য কাজে মন দিলেন ।
বাগান করা তার নেশা । সকাল-সন্ধে হাজার কাজের মধ্যেও তিনি ঠিক বাগানে নামবেন । মাটি নিড়াবেন, আঙুলের চাপে গুড়ো গুড়ো করে দেবেন মাটির ঢেলা, জল দেবেন,মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবেন সার । দুর্বল গাছের গোড়ায় কাঠি গুঁজে দেবেন । খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখবেন পাতায় পোকা লাগলো কিনা, কুঁড়িতে পিঁপড়ে হলো কিনা । নিজে হাতে চারা কিনে আনেন,ফুল,ফল,সবজী । মালী একজন আছে ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ কাজই করেন নিজে । তাই তিনি একটু বেশি রকমেরই অবাক হলেন । তার বাগানের কোণে কি গাছ গজালো তিনি জানতে পারলেন না ! সারাদিনই তাকে আনমনা করে রাখলো ব্যাপারটা । গজার সেদিন ছুটি,তাকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত শান্তি নেই ।
বিকেলের দিকে তিনি একটু বাজারে বেরলেন । যাবার পথে রাস্তার মোড়ে তার চোখ আটকে গেল । এ পথে তার নিত্য যাতায়াত । কিন্তু রাস্তার পাশে গজিয়ে ওঠা এই গাছটাকে তো তিনি আগে কখনও খেয়াল করেননি ! পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন গাছটার দিকে । তার ভুরু কুঁচকে গেল । একই গাছ কি ! হ্যাঁ তাই তো মনে হচ্ছে ! পাতার আকৃতি, গড়ন, রং দেখে যেন তেমনই লাগছে ! তবে যেহেতু এখনও অনেক ছোট তাই সঠিক করে অত বোঝা যাচ্ছে না । অচেনা কিছু মানেই উদ্বেগের কারণ, রমাকান্তও তার থেকে বেরতে পারলেন না । তবে অদ্ভুত ভাবে একটা আকর্ষণও বোধ করলেন । তার মনে হলো চারাগাছটিকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার । তার বাগানে চারাটিতো সুরক্ষিত কিন্তু এই রাস্তার পাশের চারাটিকে রক্ষা করা দরকার, না হলে ছাগল গরু মুড়িয়ে ফেলতে পারে । এমনকি মানুষের পায়ের তলায় চাপা পড়ে যেতে পারে ।
পরদিন গজা বাগানের কাজ করতে এলে প্রথমেই তিনি শুধালেন গাছটির কথা । মাথা নাড়লো গজা, বলল এতদিন মালীর কাজ করছি কিন্তু এ গাছ তো দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না বাবু । এ ভিনদেশী গাছ । কত পাখি মুখে করে কত কিছু এনে ফেলে । বাড়ছে যখন থাক, দেখাই যাক না কেমন ধারা ডালপালা ছড়ায় ।
রমাকান্ত বললেন, বেশ, তুই এক কাজ কর, রাস্তার পাশে গাছটাকে একটু ঘিরে দিয়ে আয় ।
গজা বলল যে গাছ রাস্তার পাশে গজিয়েছে তা ওমনিই টিকে যাবে, আপনারে ঘিরতে হবে না ।
রমাকান্ত বললেন, না থাক তাও তুই যা ।
ঘরে ফিরে তিনি একটা ইমেইল করতে বসলেন । কম্পিউটারের তিনি বিশেষ কিছু জানেনা, তবে হাতে লিখে চিঠি স্ক্যান করে মেইল করতে পারেন । তিনি চিঠি লিখলেন তার এক পুরনো ছাত্রকে । যে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা করছে উদ্ভিদবিদ্যার ওপরে । লিখলেন, এক অদ্ভুত গাছের সন্ধান পেয়েছি তুমি চাইলে এসে দেখে যেতে পারো । আর গাছটার নামও যদি বলতে পারো খুব ভালো হয়, চাইলে আমি গাছটার ছবি তুলেও তোমাকে পাঠাতে পারি । তবে সে ক্ষেত্রে তোমাকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে । এখনো গাছটা খুবই ছোট । অনেক সময় অনেক চেনা গাছও ছোটবেলায় অচেনা লাগে । তার ব্যস্ত ছাত্র কবে সে চিঠির উত্তর দেবে তার ঠিক নেই তবে তিনি মনে মনে বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করলেন এই ভেবে যে খুব শিগগিরই তিনি গাছটার পরিচয় বের করে ফেলতে পারবেন ।
কিছুদিন হলো এলাকা ফের উত্তেজিত হয়ে উঠছিল । বাতাসে উড়ছিল কানাঘুষো নানা খবর । ফলে গাছের চিন্তাটা ধামাচাপা পড়ে গেল । তার চেয়ে অনেক বেশি চিন্তা হচ্ছিল রমাকান্তর স্থানীয় মানুষজনদের কে নিয়ে । তিনি ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরান । শুধু তিনি কেন, এলাকার প্রায় সকলেই । রমাকান্ত ভেবে উঠতে পারছিলেন না ঠিক কোন ভূমিকাটা এখন নেয়া উচিত তার । না, পূর্বের মত ভুল আর তিনি করতে চান না । যদিও তিনি এক সময় ভাবতেন আর কখনো কোনো কিছুর মধ্যে থাকবেন না । মন যেন সন্ন্যাস চাইতো । এক স্থায়ী অবসাদ গ্রাস করে রেখেছিল তাকে । তবুও ওই স্বভাব যায় না মলে । মানুষ বিপদে পড়লে পাশে না দাঁড়িয়ে তিনি পারেন না । দীনবন্ধু এসে যখন বলল মাস্টার আপনারে খুব দরকার এখন আমাদের তখন তাকে ফিরিয়ে দিতে পারেননি তিনি । খুব মন দিয়েই শুনেছিলেন তাদের সমস্যা আর পূর্ববৎ উতলা হয়ে উঠেছিলেন । যাবো না, যাবো না, করেও ফের গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মাঠের মাঝখানে । বিপদ হতে পারে জেনেও দুই হাত চেপে ধরেছিলেন দীনবন্ধুর । বলেছিলেন ধৈর্য রাখ । খুব মেপে পা ফেলতে হবে আমাদের এবার । রমাকান্তর কথায় সকলে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের চোখে-মুখে ছিল প্রত্যয় মাস্টারই আমাদের সঠিক পথ দেখাবে । এই অসহায় মানুষগুলোর বিশ্বাসের ভার অনেক । সেই ভার বহন করার মতো শক্তি ও বুঝি আর নেই তার । তবু তিনি ফেলতে পারেননি এদের ।
আজ থেকে নয় রমাকান্ত কে এই গাঁয়ের মানুষ শ্রদ্ধা ভক্তি করে প্রায় ঐ হাইস্কুলের জন্ম লগ্ন থেকেই । তখন নতুন ইস্কুল সবে তৈরি হয়েছে । ওই ইস্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এই গ্রামে এসেছিলেন তিনি । স্কুলের পাশেই জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন তারপর সারাটা জীবনই তার কেটে গেল এই ইস্কুল আর এলাকার মানুষজন কে নিয়ে । কতো ছাত্রকে মানুষ করেছেন ! শুধু তাই নয় তাদের সুখে-দুখে পাশে থেকেছেন, পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন, এখানে বেশিরভাগই দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান সব । কারো নিজের একখণ্ড জমি আছে তো কেউ ভাগ চাষ করেন । বেশিরভাগই প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষ বাস করেন । আধুনিক চাষবাসের হাল-হকিকত ও জানা নেই কারো । উন্নত ধান বীজ, সার ইত্যাদি কেনার মত সামর্থ্যও নেই সবার । আর ট্র্যাক্টর,স্যালো, সেসব তো আরো চাপের । কিভাবে লোন তোলা যায়, কিভাবে মাঠে জল আনা যায়, এসব পরামর্শ নিতেই তারা ছুটতেন মাস্টার বাবুর কাছে । রমাকান্ত সাধ্যমত বাতলে দিতেন পথ । তার একটাই স্বপ্ন এলাকার উন্নতি । বাচ্চাগুলোর যেন অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ না হয় ।
তারপর কি থেকে কি হয়ে গেল । সেসব বহু যুগ আগের কথা । এলাকার বিধায়ক ননী বিশ্বাস সেদিন ডেকে পাঠিয়েছিলেন রমাকান্ত কে । মাস্টারমশাই বসুন,কথা আছে । রমাকান্ত জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছিলেন । রাজনীতির সঙ্গে তার সংস্রব ছিল না কোন ।
ননী বললেন, এলাকার মানুষ চাষবাস করে আর কপয়সা পায় বলুন !
রমাকান্ত মাথা নাড়লেন, সেই, তবে এ ছাড়া আর কী বা করতে পারেন তারা ।
টেবিলের উল্টো দিকে বসা ননী মাথাটা এগিয়ে এনেছিলেন, পারে মাস্টারমশাই পারে । আর সেই জন্যই তো আপনাকে এখানে ডেকেছি ।
রমাকান্ত বললেন, কী রকম ?
ননী বললেন, ওপর মহল থেকে খবর এসেছে এ জায়গায় একটা বড় কারখানা তৈরি হতে পারে । ভাবতে পারছেন মাস্টারমশায় একটা কারখানা তৈরি হলে জায়গাটা কোথায় চলে যাবে ! কোনো মানুষের আর কোনো কষ্ট থাকবে না । ঘরে ঘরে চাকরি ।
বিস্ফারিত চোখে ননী বিশ্বাসের কথাগুলো শুনছিলেন তিনি । এও কি সত্যি ! রমাকান্ত যে কী দুঃখ পেতেন তার মেধাবী ছাত্রগুলো কাজের অভাবে, রুজি-রোজগারের অভাবে ওই চাষের জমিতেই হাল ধরত, উপায়ন্তর না দেখে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো । একটা কারখানা মানে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আরো নানান আয়োজন । সত্যিই তো বেঁচে যাবে পরিবারগুলো । তিনি বললেন, বেশ তো, সে তো খুব ভালো কথা ।
ননী বিশ্বাস বললেন,ভালো তো বটেই মাস্টারমশাই কিন্তু মানুষগুলো বুঝলে হয় । আমি টুকটাক কথা বলে যা বুঝেছি এরা খুব একটা রাজি নয় । আপনার কথা গাঁয়ের লোক খুব মানে । আপনি যদি একটু চেষ্টা করেন সবাইকে বুঝাতে ।
ঘাড় নাড়লেন রমাকান্ত, বেশ আমি বুঝাবো । তবে গরিব মানুষগুলো জমির দাম পাবে তো ? সরকার তার দায়িত্ব না নিলে পুঁজিপতিদের আচরণের ওপর আমার ভরসা নেই । আর আমার আদর্শেরও তা পরিপন্থী ।
ননী বিশ্বাস বললেন, না না মাস্টারমশাই, সরকার মধ্যস্থতা করবে বলেই তো বড় মুখ করে আপনাকে দায়িত্ব দিচ্ছি ।
সেদিন দায়িত্বে সম্মত হয়ে ফিরে এসেছিলেন রমাকান্ত । তারপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেগে পড়েছিলেন জনসমর্থন আদায়ের কাজে । সকলকে বোঝাতে শুরু করেছিলেন শিল্প-কারখানার কতখানি প্রয়োজনীয়তা এ অঞ্চলে । সফল হয়েছিলেন তিনি । বেশিরভাগ মানুষকে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলেন প্রয়োজনে জমি ছেড়ে দিতে । সরকারের সঙ্গে লগ্নিকারী সংস্থার কথাবার্তাও অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিল । কিছু অংশে কাজ শুরুই হয়ে গিয়েছিল এক প্রকারে । সরকারের কাছে আস্থা বেড়েছিল রমাকান্তর । দলের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের ঘনঘন ডাক পড়ছিল তার । জমির দাম নির্ধারণ, বিলিবণ্টন, সব কাজেই সরকারপক্ষ ভরসা করছিলেন রমাকান্তকে ।
কিন্তু হঠাৎ করেই রমাকান্ত লক্ষ্য করলেন হিসেব-নিকেশ সব যেন পাল্টে যাচ্ছে । প্রায় রাজি হয়ে যাওয়া চাষীরাও জমির দাম হাঁকছে বেশি করে । রমাকান্তের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে তাদের উষ্মা । রমাকান্ত যেন ইচ্ছে করে বুঝিয়ে বাজিয়ে তাদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিচ্ছেন । তিনি টের পেলেন একজন একজন করে বেশিরভাগ চাষীরাই বেঁকে বসছে জমি দিতে । স্থানীয় মানুষজনদের রাতারাতি এমন ভোলবদল বিস্মিত করছিল তাকে ।
সরকারপক্ষ ডেকে পাঠালেন রমাকান্তকে । জিজ্ঞাসা করলেন কেন এমন ঘোরালো হয়ে উঠছে পরিস্থিতি । রমাকান্ত সঠিক করে কিছুই বলতে পারলেন না । তারা দু দিক থেকে চাপ দিতে লাগলেন রমাকান্ত কে । কাজ এতদূর এগিয়ে গিয়েছে, ইট কাঠ, চুন-সুরকি, বালি, কংক্রিটের স্ল্যাব সবকিছু ফেলা হয়ে গিয়েছে, দিশাহারা অবস্থা তখন সরকার এবং মালিকপক্ষ সবার । ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়ে উঠল জনতার রোষ । রমাকান্ত অবাক হয়ে দেখলেন সেই আন্দোলনরত জনতার পুরোভাগে ননী বিশ্বাস !
রমাকান্ত পাগলের মত বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলেন এমন সর্বনাশা খেলায় তোমরা মেতো না । যাদের জমিতে ইতিমধ্যে কারখানা তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে তারা যে পথে বসবে ! এই এলাকাটাও ডুবে যাবে চির অন্ধকারে । কিন্তু সে কথা কেউ শুনল না । সরকার বিরোধী শক্তি এসে যোগ দিলো আন্দোলনে । দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়ল সেই আন্দোলনের কথা । রমাকান্ত প্রতিপন্ন হলেন একজন কৃষক বিরোধী নেতা হিসেবে । যিনি গরিবের অন্ন কেড়ে খাওয়ার চক্রান্তে শামিল ! হায়রে অদৃষ্ট, এও দেখবার জন্য বেঁচে ছিলেন তিনি ! অবসর গ্রহণের পরে ছেলেরা ডাকলেও এই গাঁ জমি ছেড়ে কোনদিন শহরে যাবার কথা ভাবেন নি । এই সব তার প্রানের প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে এই প্রতিদান পাবেন বলে !
এরপরই ঘটল চূড়ান্ত ঘটনা । একদিন কারখানার লোহালক্কর বোঝাই দুটো গাড়ি কে আটকে যখন বিক্ষোভ দেখাচ্ছে কিছু মানুষ তখন কোথা থেকে এক ভ্যান পুলিশ এসে বাতাসে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে আবার মিলিয়ে গেল কোথায় । বাতাস থেকে আর মানুষের বুকের দূরত্ব কতটুকু ! দেখা গেল মারা গিয়েছেন দুজন কৃষক । ব্যাস, হু হু করে আগুন ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র । রমাকান্ত লক্ষ্য করলেন সাধারন গরিব গুর্বো মানুষ গুলোর স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ালেন বিশ্বের বিভিন্ন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র শক্তি । বড় বিপন্ন বোধ করছিলেন রমাকান্ত। ক্ষমতা বদল আসন্ন বুঝতে পারছিলেন । সেদিন একমাত্র কৃষক নেতা দীনবন্ধু এসে দাঁড়িয়েছিল রমাকান্তর পাশে, বলেছিল মাস্টারমশাই আপনি এসবের মধ্যে থেকে সরে যান নাহলে ওরা আপনাকে মেরে দেবে । এখন আমাদের দলের বেশির ভাগ মানুষই যে ওদের দলে । কে যে কাকে তাক করে গুলি ছুঁড়ছে আপনি ধরতে পারবেন না ।
সত্যিই বদল হলো সরকারের । ননী বিশ্বাস অধিক ক্ষমতা পেয়ে চলে গেলেন শহরে । যে সব চাষের জমি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তারা সরকার থেকে পেল সামান্য ভাতা । এলাকার কোনো বদল হলো না, না হল সেখানে কারখানা না তারা পেল কোন উন্নততর জীবনের সুযোগ । রমাকান্ত সবরকম সামাজিক কাজকর্ম থেকে নিজেকে সরিয়ে ছাত্র পড়ানো আর বাগান করা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেন । বুকের মধ্যে একটা অব্যক্ত কষ্ট রয়ে গেল শুধু । তিনি বুঝে পেলেন না সরকারের পুলিশ সেদিন খামোখা কেন মারতে গেল দুজন কৃষককে । তখন তো তারা বুঝে গিয়েছিল ওই অঞ্চলে কারখানা স্থাপন আর সম্ভব না ।
কেটে গেলো দু দুটো দশক । সেদিনের ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো বড় হয়েছে আজ । একদিন তারা এসে ছেঁকে ধরল রমাকান্ত কে । মাস্টার দাদু আমরা আজ সব বুঝতে পেরেছি । আমাদের মা-বাবারা সেদিন ভুল করেছিলো । ওরা তো অতো লেখাপড়া জানতো না তাই ওদের ভুল বোঝানো হয়েছিল । আসলে বিশ্বব্যাপী দুই শক্তিধর দেশের মধ্যে নীতির লড়াই । আমাদের এই গ্রাম টুকু তার মধ্যে পড়ে গেছিল । কৃষক মজুর নওজোয়ান চল রে চল রে চল । তাদের কি কখনো দমিয়ে রাখা যায় বল মাস্টার দাদু ? আমরা আবার লড়াই করব । কারখানাকে আমরা ফিরিয়ে আনব আমাদের মাটিতে । চকচক করে উঠল রমাকান্তের চোখ, বললেন তোদের দেখে আমার এই প্রত্যয় হচ্ছে তোরা পারবি । আমার আশীর্বাদ রইল তোদের সঙ্গে ।
তারা বলল, না দাদু শুধু আশীর্বাদ দিলে হবে না তোমাকে থাকতে হবে আমাদের সঙ্গে ।
রমাকান্ত হেসে বললেন, আমার কি আর সেই শক্তি আছে !
তারা বলল, তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না তুমি শুধু আমাদের মিছিলের আগে আগে হাঁটবে ।
বেশ-বেশ আমি ভেবে দেখব, বলে আপাতত ছেলেমেয়েগুলোকে আশ্বস্ত করে বিদায় দিলেন রমাকান্ত ।
আর তার ঠিক দু'দিন বাদেই বাগানের কোণে তার চোখে পড়ল নতুন চারা গাছটিকে ।
একদিন রাতের অন্ধকারে দীনবন্ধু এলো । বললো আমাদের পুরনো নেতারা আবার যাতায়াত শুরু করেছে গ্রামে । আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে আবার খেপাচ্ছে । আমরা ওদের বিশ্বাস করিনা । ওরা কে কখন কোন দিকে পাল্টি খাবে । বন্দুকের নল যাদের ক্ষমতার উৎস তাদের কি কখনো বিশ্বাস করা যায় ! ওরা পয়সার জন্য যখন তখন নীতি-আদর্শ বিক্রি করে দেয় । সেদিন পার্টির ওপর মহলে আপনার কদর বাড়ছিলো বলে ননী বিশ্বাস তলে তলে অন্যদের সঙ্গে হাত মিলালো, আমাদের ভুল বুঝলো,আজ আপনার কাছে এসব কথা স্বীকার যেতে কোন লজ্জা নেই আমার । মাঝখান থেকে দু দুটো প্রাণ চলে গেল । আমার ধারণা ননী বিশ্বাসই সেদিন গুলি চালানোর ব্যবস্থা করেছিল । আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে যেন এই অন্যায় না হয়, আপনি এদের বোঝান মাস্টারমশাই ।
গভীর চিন্তায় মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন রমাকান্ত ।
ই-মেইলের উত্তর এসেছে রমাকান্তর কাছে । তার উদ্ভিদবিজ্ঞানী ছাত্রটি লিখেছে, মাস্টারমশাই আপনার চিঠি পেয়ে ভালো লাগলো । গাছটি সম্পর্কে আমি খুবই আগ্রহ বোধ করছি । অনেক দিন দেশে ফেরা হয় না । ভাবছি একবার দেশ থেকেও ঘুরে আসব আর নিজে গিয়ে দেখে আসব আপনার গাছটিকে ।
রমাকান্ত লিখলেন বেশ এসো । এর মধ্যে আরো কিছু গাছ এদিকে ওদিকে বেড়ে উঠেছে । এ গাছের বৃদ্ধি ও বেশ দ্রুত, ছড়িয়ে ও যাচ্ছে বেশ দ্রুত । এইভাবে কচুরিপানা ও একদিন ছড়িয়ে গিয়েছিল । পার্থেনিয়াম ও । গাছগুলো রাখব কি উপরে ফেলব এই দ্বন্দ্বে আছি । তোমার মতামত পেলে সিদ্ধান্ত নেব ।
গাছগুলো ইতিমধ্যে বেশ ডালপালা মেলছে, সবুজ পাতায় ছেয়েছে । রমাকান্তর উদ্ভিদবিজ্ঞানী ছাত্র এলেন রমাকান্তের বাড়ির সেই গাছ দেখতে । তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন গাছের ত্বক,ডালপালা, পাতা । ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নীচে ফেলে পরীক্ষা করলেন পত্ররন্ধ্র থেকে কোষকলা, তারপর মাথা উঁচু করে বললেন চিনতে পেরেছি মাস্টারমশাই । সুদূর ভিয়েতনাম থেকে উড়তে উড়তে এসেছে এ গাছের বীজ । সেই ষাটের দশকে উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গরিলা সেনারা বিরাট বনাঞ্চলে লুকিয়ে থেকে লড়াই করতেন প্রতিবেশী দেশ তথা ধনতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে । আপনার তো কিছুই অজানা নয় মাস্টারমশাই । সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অপারেশন র্যাঞ্চ হ্যান্ড নামে এক অভিযান চালায়, আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই । যেখানে তারা বিমান থেকে ৪৫ লাখ একর জমিতে এজেন্ট অরেঞ্জ নামে এক বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে গেরিলাদের লুকিয়ে থাকার শেষ আশ্রয় সেই বনাঞ্চল নষ্ট করে দেয় ! প্রথমে গাছগুলোর পাতা ঝরে যায়, তারপর গাছগুলো মরে যায় । তাতে বাহিনীর উপর থেকে বোমাবর্ষণের আরও সুবিধা হয়ে যায় । এই সেই গাছ মাস্টারমশাই আবার এতদিন পরে নতুন করে বেঁচে উঠেছে আমাদের আশ্রয় দেবে বলে । আর কিছুদিন গেলে এরা আরো সংখ্যায় বাড়বে, তৈরি করবে ক্যানোপি, পাতার আচ্ছাদন ।
আবেগে রমাকান্তের চোখের কোণে
জল টলটল করে ওঠে, ছাত্রের দিকে ফিরে বলেন, সত্যি বলছো ? কি নাম এই গাছের ?
ছাত্রটি বলে সে যে নামই হোক মাস্টারমশাই গাছের নাম তো হয় স্থানীয় মানুষজন দেয় নয় উদ্ভিদবিজ্ঞানী । আমি না হয় আজ এই গাছের নতুন একটা নাম দিলাম । গাছটার নাম দিলাম সত্য । সত্য মাটি ফুঁড়ে উঠেছে ।
ছাত্রর হাত দুটো নিজের দুই হাত দিয়ে চেপে ধরলেন রমাকান্ত ।

0 মন্তব্য
প্রদর্শন
আড়াল