Published Date:10-10-2021
1602571644.jpg?v=1060163466

গল্প

তক্ষক

শর্মিষ্ঠা সাহা

যতদূর তাকাই উত্তল লেন্সের মতো প্রান্তর জুড়ে শুধুই বালি । ধূ ধূ মরু । মাঝে মাঝে মরীচিকা হয়, কিন্তু মরুদ্যান কোত্থাও নেই । কলকাতা থেকে ট্রেনে বাড়ি ফিরছি । স্কুলে পুজোর ছুটি । ভাবছি এবার দাদুবাড়ি যাবো একবার । বহুবছর হলো যাওয়া হয় না । যাওয়াটা নিয়মিত ছিলো ছোটবেলায় ।

              ছোটবেলায় গরমের ছুটি মানেই দাদুবাড়ি । মাঝখানে আয়তাকার সিমেন্ট বাঁধানো উঠান ।  তিনদিকে ঘরগুলো দাঁড়িয়ে পাশাপাশি । দোতলা । রেলিং বিহীন খোলা ছাদ । একদিকে বাগান, শিব মন্দির আর মাধবীলতার ছাউনি দেওয়া গ্রীলের গেট ।

      দুটো পুকুর ছিলো । মাঝের পরিসরে আমবাগান । ওতে লিচুগাছ ছিলো গোটা তিনেক । পাখির অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য তাতে একটা টিন লাগিয়ে দড়ি দিয়ে ছোট্ট লাঠি বেঁধে দেওয়া হতো ঘন্টার মতো । দড়ির আরেকপ্রান্ত জানালা দিয়ে টেনে ঘরে খাটের সাথে বাঁধা থাকতো । মাঝে মাঝেই দড়ি ধরে টান দিলে ওপাশের লিচুগাছে ঢং ঢং আওয়াজ হতো আর পাখি এলেও ভয়ে পালিয়ে যেত । আমি দুপুর হলেই দড়ি নিয়ে জানলায় বসে পড়তাম ।

পুকুর থেকে ভেসে ভিজিয়ে দিতো আমায় আর্দ্র বায়ু । পুকুরপাড়ের বাঁশঝোপ, বেগুনি কচুরিপানা আর হলুদ করবীর গাছ সম্মেলনে হাজির । পুকুরের ওপাশেই বিল্টুদা'দের ঘর । মাটি আর চাটাইএর দেওয়াল । টিনের চাল । তাতে বৃষ্টি পড়লে আলোর ঝর্ণা নামে, লোডশেডিং হলে জ্যোৎস্না ঢোকে নকশী কেটে । অনেকদিন ও বাড়িতে সকালে গিয়ে চা মুড়ি খেয়েছি । বিল্টুদার মাকে কাকিমা বলতাম । কী ভালো রাঁধতো এঁচোড়ের ডালনা ! অনেকদিন লোডশেডিং'এর সময়ও থেকেছি, দেখেছি লণ্ঠন জ্বেলে বিল্টুদা একমনে অঙ্ক করছে । আর খাতার পেছনে মাঝে মাঝেই কিছু একটা লিখছে । পরে একদিন লুকিয়ে দেখেছিলাম পেন দিয়ে আঁকা নিখুঁত মুখাবয়ব ।মেয়ের । কিন্তু কখনো চাইবার ইচ্ছা বা সাহস হয়নি । শুধু আবেশ ছড়িয়েছিল মন, মন থেকে শরীরে । ওটা কি আমি ! আমি এত সুন্দর !

             পুকুরের ওই প্রান্ত থেকে সাঁতার কেটে এপাশের ঘাটে উঠে বসতো বিল্টুদা । বুকের ভেজা লোমগুলো শরীরে লেপ্টে চুঁইয়ে পড়তো জল সরু রেখায়, কখনো কানের লতিতে ফোঁটার দ্যুতি,কখনো ভেজা কপাল আর চিবুকের খাঁজ । আমি বেশ বুঝতে পারতাম তক্ষক হিসহিস করছে আঙুলের ডগায় আর ঠোঁটে । ফুলে উঠতো ঠোঁট, গোলাপি রঙ গাঢ় থেকে গাঢ়তর । লিচু গাছের ঢং ঢং শব্দ আরো ঘন হতো ।

             গামছার একটা অংশ নিংড়ে জল ঝরিয়ে মাথা আর গা আলগা করে মুছে বিল্টুদা এগিয়ে আসতো আমার জানলায় । আমার সব রক্ত তখন গলে জল হয়েছে । মা বলে, 'নুন বেশি খেলে রক্ত জল হয়ে যায়' । আমি তো ততক্ষণ নুনই খাচ্ছিলাম ।  টুক করে মুছে ফেলতাম নোনা দাগ ।

–কী রে, অত জোরে শব্দ করলে কেউ ঘুমোতে পারবে দুপুরে ? পাগলী !

–পাখিগুলো যায় না যে !

–কখন চলে গিয়েছে ! এই শব্দে দূর দূরান্তের পাখিরাও আসবে না ।

–তুমি এত বেলায় স্নান করো কেন ? সবাই দুপুরের খাওয়া সেরে ঘুমোতে গিয়েছে ।

–আমার অবেলায় বেলা হয় ।

বলেই একটা তীক্ষ্ণ হাসি হাসতে হাসতে কোমরে গোঁজা কৌটো থেকে হাতে বের করতো গুরাক্ষু । তর্জনীতে নিয়ে সোজা চালান করতো গালের পাশে ।

–ওগুলো কী ?

–তুই নিবি ?

–ছিঃ, কী গন্ধ ! কী করে এসব মুখে নাও !

– নিয়েই দ্যাখ ! শরীরের জ্বলন কমে যায় ।

আমার তখন ন'দশবছর বয়স । বুঝতে পারতাম না,বিল্টুদা কী ভাবে বুঝলো আমার শরীর জ্বলছে । আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম বিল্টুদার দিকে । তর্জনী দিয়ে ওই কালো পদার্থটি দাঁতে ঘসছে আর দাঁতগুলো লাল হয়ে যাচ্ছে । অনেকক্ষন কিছু বলছি না দেখে বিল্টুদা মাঝে মাঝে এঁটো আঙুল জানলার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে আমার নাকের ডগায় লাগিয়ে দিতো ।

–কী দেখিস রে পাগলী !

বিশ্রী গন্ধে গা ঘিনঘিন করে উঠলেও বেশ বুঝতে পারতাম তক্ষকটা শান্ত হচ্ছে । তারপর আবার পুকুরে ঝপাং শব্দ । দু'চারটে ডুব দিয়ে আমার দিকে হাতছানি । ওপাশে একসময় মিলিয়ে যেত বিল্টুদা ।

                তখন ওর মাধ্যমিক । নবান্নে দাদুবাড়ি ছিল বেশ জমজমাট । আরও দুই মাসি, তাদের ছেলেমেয়ে, মামারা সবাই । একটা উৎসব । বাইরের জামগাছের গোড়ায় একটা পুরোনো টিনের ঘর । তাতে পাশের বাড়ির পাঁচু, সাবানা, শ্রাবনীদি, মিতুদি, বিল্টুদা আর আমরা সবাই খেলতাম । সেই খেলায় মাঝে মাঝেই বিল্টুদাকে বর সাজানো হতো । আর আমার মাসতুতো দিদি বউ সাজতো ! কেন যে চিনচিন ব্যথা হতো বুঝিনি কোনদিন । বিল্টুদা একবার আমার দিকে আর একবার আমি বিল্টুদার দিকে তাকাতাম । শুনতে পেতাম বেশিরভাগ দিন মামী বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ছে অথবা শনিবারের বারঠাকুরের পুজো হচ্ছে । প্রসাদ খেয়ে পা ধুয়ে ঘরে ঢুকতে হবে ।

                      পাঁচুদের বাড়িতে সার বেঁধে তালগাছ ছিল প্রায় ত্রিশটারও বেশি । আমি ছাদে উঠে অবাক হয়ে দেখতাম সব গাছে বাবুইএর বাসা ঝুলছে । যেন ঝালর নেমেছে । সন্ধেয় জোনাকীদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরে আসতাম দর্জিপাড়ায় । সাবানার মাকে তালাক দিয়েছিলো ওর আব্বা । সাবানা খুব ছোট তখন ।আব্বাকে ওর মনেই পড়তো না । সাবানার মা সেলাই মেশিন কিনে এই পাড়ায় একটা ব্লাউজ বানানোর দোকান খুলছিলো । চলে যাচ্ছিলো ওদের দুজনের পেট । সেলাই মেশিন কেনার টাকা দিয়েছিলো শম্পার বাবা । এমনকি ওদের একচিলতে বাড়ির জায়গাটুকু কেনার টাকাও । সাবানা জানতো, কালুমামা ঘরে এলে মায়ের নিজের কিছু কথা থাকে । তখন সাবানাকে পাড়া ঘুরতে বেরোতে হয় । প্রথমে দু'একবার জিজ্ঞেস করলেও পরে আর করেনি । এ পাড়ায় কেউ ওদের সাথে কথা বলে না । আমার সাবানাকে খুব ভালো লাগতো । বিকেল হবার মুখে ওকে নিয়ে আমবাগানে ঘুরে বেড়াতাম । বনকুল খেতাম আর বিচিগুলো ফুঁ দিয়ে ছুঁড়ে ফেলতাম পুকুরে ।মাঝে মাঝে ও আমার হাত ধরে কেঁদে ফেলতো । পড়াশুনা করতে চাইতো । কিন্তু...

       আমি সাবানাকে বলেছিলাম আমার পুরোনো বইগুলো ওকে দিয়ে দেবো । একদিন খেলতে খেলতে শম্পা ওকে ঠেলে নীচে ফেলে দিয়েছিলো । আরো কত কথা বলেছিল চিৎকার করে, সেসব আমার মনে নেই । শুধু মনে আছে সাবানার পা কেটে রক্ত পড়লেও চুপ করে দাঁড়িয়ে শম্পার সব কথা শুনছিলো । পরের বছর গরমের ছুটিতে দাদুবাড়ি গিয়ে শুনি সাবানা আর ওর মা গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে । মামি আর মা বলেছিলো, জ্বালা জুড়িয়েছে । ওদের শরীরেও তক্ষক ঢুকেছিলো নাকি !

            গোটারাত ট্রেন জার্নি করে এসেছি । খুব ক্লান্ত । খাবার টেবিলে মাকে জানালাম, এবার একবার দাদুবাড়ি যাবো ।

–ঘুরে আয় । অনেক বছর যাস না তো !

–কারো সাথে দেখা হবে কী না কে জানে !

–সবাই বড় হয়েছে । ওখানে কেউ থাকে নাকি !

–তুমি জানো সবার খবর ?

–পাঁচু তো মুম্বাইতে থাকে । তরকারির ব্যবসা করে ওখানেই ।

–পাঁচু  ! ও তো ঠিক করে কথাই বলতে পারতো না !

–দেখ গিয়ে, ওখানে ফ্ল্যাট কিনেছে প্যারেল'এ ।

–বাব্বা !

–ওর মাকে নিয়ে গেছে । 

–মা,শ্রাবনীদিরা কেমন আছে ?

–ভালোই । ওদের বাড়িতে বাজ পড়েছিল গত সপ্তাহে । বৌদি বললো টিভিতে আগুন ধরে সে হুলুস্থুলু ব্যাপার ।

–আর বিল্টুদারা ?

–বিল্টুর খবরটা শুনেই মনখারাপ হয়ে গেলো । ছেলেটা বিয়ে করবে না করে করে বৌদি জোর করে বিয়ে দিলো । এখন ঝাল বুঝছে ।

–কী হয়েছে মা !

–সেই মেয়ে বিয়ের এক বছরের মধ্যে গেল মাসে গায়ে আগুন দ্যায় । মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে পুলিশে এফ আই আর করেছিলো । বিল্টুকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো ।

–কী বলছো ! তারপর !

–তারপর আবার কী ! বৌদিকেও নিয়ে গিয়েছিলো । সন্তু ওর বউ ছেলে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলো । খবর শুনে আর এদিকে আসেনি । নারানদা তো থানায় অসুস্থ হয়ে যায় । ওখান থেকেই হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিলো । পনেরদিন পরে বাড়ি ফিরেছিল । তবে যা খবর পেলাম তাতে বেশিদিন আর নেই ।

–এসব কবেকার কথা মা ? আমাকে জানাওনি কেন !

–তুই শুনে কী করবি ! আমি বৌদিকে ফোন করেছিলাম তাই জানলাম । পাড়ার কেউ ওদের সাথে কথা বলে না ।

–বিল্টুদা কী করতো মা ?

–ওই তো ! কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট । একটা ওষুধের দোকান খুলেছিলো । ভালোই হচ্ছিলো রে ! কলকাতা থেকে ডাক্তার এনেছিলো । সপ্তাহে একদিন ।

–এখন ?

–এখন আর কী ! বন্ধ । বেল পেয়েছে । বাড়ি ফিরেছে মাসখানেক । কিন্তু দোকানে যাবে কি ! ওর দোকান খোলার মুখ আছে না কেউ যাবে ওষুধ কিনতে !

–কিন্তু মা,বিল্টুদা কিছু করতে পারে বলে তোমার মনে হয় !

–মনে তো হয় না । কিন্তু মানুষের স্বভাব বদলাতে কতক্ষন !

–তবুও ! বিল্টুদা...

–পাড়ার সবাই বলাবলি করে, বউটা নাকি কিসব কাগজ খুঁজে পেয়েছিলো । অনেক চিঠি।ছবি । তারপর বিল্টুও তো কেমন সন্ন্যাসীদের মতো হয়ে গিয়েছিলো । জোর করে বৌদি বিয়ে দিয়েছিলো । বউকে ছুঁতোও না । এসব কতদিন একটা মেয়ে সহ্য করবে ! নতুন বিয়ে হয়ে এসেই যদি এগুলো দেখে তাহলে !

–চলে যাবে বাপের বাড়ি । এসব কী !

–সবাই তো তোমার মতো শহরের নয় । ওগুলো কলকাতায় হয় । গ্রামে ওসব হয় না । তুই তো কতকাল হলো যাসনি দাদুবাড়ি । বাবা মারা যাবার পরে আর গেছিস ?

–না । প্রায় নয়-দশ বছর হবে যাওয়া হয়নি ।

–একবার ঘুরে আয় । ওদের বাড়ি যাস না । মামীই না করবে । বিল্টু এখন কেমন পাগলের মতো হয়ে গেছে । মেয়েটা নাকি কাগজগুলো,ছবি সব একজায়গায় করে কেরোসিন ঢেলেছিলো । তখন বৌদি বাড়ি ছিলো না । বিল্টুর তো দোকানে থাকার কথা সে সময় । কিন্তু বিল্টু দোকান থেকে সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছিলো ।এসেই দেখে ঘরের মধ্যে আগুন জ্বলছে । ও তাড়াতাড়ি নেভাতে যাবে বলে এগিয়েছে আর ধ্বস্তাধ্বস্তিতে ওর বউয়ের গায়ে কেরোসিনের ডাব্বা চলকে পড়ে একমুহূর্তে আগুন ধরে যায় । হাসপাতাল অব্দি নিয়ে যেতে পারেনি ।

                  ট্রেন জার্নির ক্লান্তিটা কেমন পায়ের আঙ্গুল থেকে গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো গুটিগুটি করে । আমার মধ্যে তক্ষকটা কি এখনো আছে ? আস্তে আস্তে উঠে আয়নায় দাঁড়ালাম । নাঃ, কোত্থাও মরুদ্যান নেই।ভাবলাম কিছু আঁকড়ে ধরি, পা দুটো কাঁপছে । হাতে উঠে এলো একমুঠো বালি । ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে আঙুলের ফাঁক দিয়ে । নেমে আসছে সন্ধ্যা উটের কুঁজের মতো । একটা অসম্পূর্ণ উপন্যাস বালির খাঁজে আটকে পলি হয়ে যাচ্ছে । কতদিন ঘাটে বসে পা ডোবাইনি জলে ! ঝপাং শব্দ শুনিনি ! একটু পরেই মা তুলসীতলায় সন্ধ্যা দেবে আর ঘরে বাতি নিয়ে এসে বলবে 'সন্ধ্যা দিচ্ছি । অবেলায় ঘুমায় নাকি কেউ ! অমঙ্গল ! ওঠ শিগ্গির !'

আয়নার কাঁচে হাত রাখলাম । 'আমার অবেলায় বেলা হয়' ...

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন