Published Date:10-10-2021
1592726062.jpg?v=368805775

গল্প

৩০ সেপ্টেম্বর

হাসান মুস্তাফিজ

সো, বাংলাদেশের প্রথম আবিষ্কৃত, আলোচিত এবং জনপ্রিয় সাইকোর একমাত্র দুঃখ, সে আর মগাবাজারের "পুষ্প কর্নার" নামের দোকানে আর যেতে পারবে না । এইজন্যেই সে বিশ্বসাইকোদের কাতারে পড়বে । আবার নাও পড়তে পারে, তাকে নিয়ে যে কোনো ধর্ষণের রেকর্ড নাই । সব ঘেটে দেখা যায় তার সব মেয়ে বন্ধুও তাকে ঘিন্না করে । কোনো সোশ্যাল গ্যাদারিংয়ে সে ছিল না । এত অবশ্য তার নিষ্পাপত্ব প্রকাশ পায় না, এতে প্রকাশ পায়, সে একজন কাপুরুষ ।

সো, সে একজন সাইক (ওহ সরি,টাইপিং মিস্টেক) ।  

আস্তে আস্তে প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হচ্ছে । কোনো নারী আর গৃহিনী থাকে না । সেক্ষেত্রে প্রতিটি বাংলাদেশি ফ্যামিলির স্বামীর মাথায় সেন্স এসেছে যে, বাথরুমেও এয়ার ফ্রেশনার লাগে । এগুলো অধিকাংশই মায়ানমারের পণ্য । কিন্তু তাই বলে টিভিতে টয়লেট ক্লিনার লিকুইডের অ্যাড কমেনি । আবার এসব ইনোভেটিভ চেঞ্জও আনেনি । পিছিয়ে আছে কিছুতে ।

চ্যারিটির কাজ প্রশংসনীয় । প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ বাড়ছে । আর প্রাণী বলতে কুকুরকুলের কথা আসছে । তাদের জন্য গরুর ভুনা দিয়ে খিঁচুড়ি রান্না হয় । সেগুলা অবশ্যই সুস্বাদু হবে কারণ খাওয়ার পরও কুকুরগুলো পলিথিন চাটতে থাকে । সেদিক দিয়ে বলা যায়, পরিবেশ রক্ষার কমনসেন্স এদের হয়নি । কোনো কুকুর অভুক্ত থাকতে পারবে না এদেশে । হয়ত এসব স্বেচ্ছাসেবকরাও বুঝে গেছে, মানুষের চেয়ে কুকুরের ক্ষুধার্তনাদ আরও বেশি ।  

চাঁদমারিরা জানে, পুনরুজ্জীবন আসছে । 

মুখোশ বানানো লাগবে আবার, বুঝাতে হবে সবাই ভালো । সবাই স্মার্ট, আধুনিক, স্বাধীন এবং আরো কিছু….

এই দেশটায় ভালো বোটানিক্যাল গার্ডেন নেই । সরীসৃপদের ব্যাপারে কেউ জানে না ।

কোনো বাংলাদেশি ফিল্ম ডাইরেক্টর এখনও ম্যানহোলের ভিতরের দৃশ্য কিংবা ম্যানহোলের তলে কীভাবে টিকটিকি বিচরণ করে সেসব তাদের সিনেমায় আনতে পারেনি ।

কিন্তু "The Third Man" তাদের প্রিয় সিনেমা হয়ত, কারণ তারা ওরসন ওয়েলেসের নাম সেভাবে নেয় না ।

(মনোলোভা) 

★★★

তিনি, সিরাজ সরকার, বেশিক্ষণ হয়নি অপেক্ষা করছেন যে । মেডিকেল সেন্টারটা দুই সপ্তাহের জন্য বুকিং করা হয়েছে । চেয়ারগুলো কাঠের, কোনো পেরেক নেই যেটা লুজ ফিটিং বা চাইলে খুলে হাতে লুকিয়ে রাখা যাবে । টেবিল ফ্যান আছে সাথে । সিরাজ সরকার এই প্রথম আফসোস করতে লাগলেন তার কেন কোনো ছেলেমানুষী বদভ্যাস নেই । সময় কাটতে চায় না । 

ছেলেটার ফটোগ্রাফ দেখেছেন দুই বছর আগে । তখন তার বয়স ২১ বছর ছিল । ছেলের গড়ন দেখে বুঝা যায়, সে ওজন কমানোর চেষ্টা করছিল । তাই থুতনিটা বেমানান লাগছিল ফটোগ্রাফে । কিন্তু ঘাড় বা গলা স্লিম লেগেছে আর কোমর একটু ঝুলে থাকবেই, স্বাভাবিক ।

বাংলাদেশে তাকে নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে । এটা আসলে এই দেশটির ভাগ্য । অবশেষে তারা এমন কাউকে পেলো, মানে সে কিন্তু ভিলেন, সামাজিক ভিজিল্যান্ট কারোর মতে । এইবার বাংলাদেশ বলতে পারবে যে তাদের দেশ থেকেও সিরিয়াস একটা সাইকো এসেছে । গডফাদার বা মবগোষ্ঠী আফ্রিকাতেও থাকে । পূর্ব-পশ্চিম জনপদ "The Godfather" মুভি দেখে ফেলেছে । যেইসব বাংলাদেশী মানুষ আসলেই একটু রাজনীতি বুঝতে চায় যেখানে কন্সপ্যারিসি থিওরি আর মতবাদের পার্থক্য আছে, যারা কথায় কথায় বলে না "ইসরায়েল ধ্বংস হয়ে যাবে " কিংবা ফিলিস্তিনের গণহত্যার যথার্থভাবে শিশুহত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে এবং যারা Al Capone কে চিনে, তারা এই ছেলেকে পাত্তা দিবে না,

ওর নাম হাসিন মাহবুব, সে আসছে জানা গেল ।

ক্যামেরাম্যান বলল — আমরা লাইভে যাচ্ছি দশ সেকেন্ডের মধ্যে

সিরাজ সরকার কিছু বলার আগেই হাসিন বলে উঠলো — দাঁড়ান, আমার কথা আছে ।

সে ঝুঁকতে পারলো না, শিকল দিয়ে চেয়ারের সাথে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে ।

মাহবুব বলল — মনোলোভাতে কী বলবেন আমাকে নিয়ে ?

সিরাজ সরকার মাথা নাড়লেন । কোনো মনোলোভা তিনি ভেবে আসেননি ।

মাহবুব হেসে বলল — আমি বর্তমানে একজন জনপ্রিয় সাইকো, আপনার উচিত আমার ইন্টারভিউ সেভাবে নেওয়া । চাইলেই আপনি অন্যান্য সিরিয়াল কিলার বা সাইকোদের ইন্টারভিউ দেখে নিতে পারতেন…

ক্যামেরাম্যান বলতে লাগল — ৩,২,১…

মাহবুব জানতো না যে সিরাজ সরকার একজন ব্যর্থ এবং পাবলিসিস্ট কবি । 

সিরাজ সরকার বলতে লাগলেন — এদেশের পবিত্রতার একমাত্র সাক্ষী আমাদের ঋতু । এইবারের বসন্ত অন্যান্য সব বসন্তের মতোই সুরভিত, আনন্দিত এবং পূর্বনির্দেশক স্পন্দিত… 

এভাবে সিরাজ সরকার বলে যেতে লাগলেন । ক্যামেরাম্যান ওদিকে ইশারা করছেন থামতে । ২৫ মিনিটের মধ্যে পাঁচমিনিটই এসব বলতে থাকলে বিশাল ট্রল শুরু হয়ে যাবে । সিরাজ সরকার মোটে ৫ লাইনে মাহবুবের পরিচয় দিয়ে দিলেন । "চলুন দর্শক… " বলে তিনি মাহবুবের দিকে ঘুরতেই লক্ষ্য করলেন মাহবুবের মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছে । সে কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা না করেই বলল — কয়টা কবিতার বই ছেপেছিলেন ?

গার্ডরা হেসে উঠলো । সিরাজ সরকার ফ্লোরে তাকিয়ে বললেন — তিনটা ।

মাহবুব বলতে লাগল — আমার ইন্টারভিউ অনেকেই নিতে চেয়েছিল । কিন্তু আমি শর্ত দিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি জার্নালিজমে পুলিৎজার জিততে পারে, তাহলে একমাত্র তাকেই ইন্টারভিউ দিব ।

কিন্তু বুঝতেই পারছেন, আমার দাবির পরিসীমা কতদূর ।

তবে আপনাকে ভালো লেগেছে আমার ।

সিরাজ সরকার সুযোগটা নিলেন । কড়া গলায় বললেন — তুমি আমাকে পছন্দ করলেও বুঝোই তো, অন্য সবার মতো আমি তোমাকে ঘিন্না করি ।

মাহবুব কিছুক্ষণ থেমে বলল — আপনি এই ধরনের কথার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন, না ?

হ্যাঁ, আমাকে আপনি ঘিন্না করতে পারেন । তবে এই কথাটা ভুল, সবাই আমাকে ঘিন্ন করে না । আমি অলরেডি এই দেশের একজন কাল্ট আইকন । এখন আমি যদি সেই পর্যায়ের ওমন আসামি হতাম, তাহলে হয়ত তাদের মতো এই ট্যাগটা বাতিল করে দিতাম, কিন্তু আমি তা না । আমি সেল্ফ ডিফেন্স করতে যেয়ে খুনী হয়ে গিয়েছি ।

সিরাজ সরকার এবার ক্ষেপে গেলেন এবং কথা বলার সময়ে তার মুখ থেকে থুতু পর্যন্ত বেরিয়ে গেল । সেই অবস্থাতেই শোনা গেল ক্যামেরাম্যান বলছে — এই ফারুক, ওকে একটা টিস্যু দিয়ে আয় না, কী বিচ্ছিরি লাগছে… ( ধরে নেওয়া যেতে পারে, এটা একটা মিমস) 

— সেল্ফ ডিফেন্স মানে ? তুমি হাসান মুস্তাফিজকে খুন করেছো । এটা সেল্ফ ডিফেন্স ? কীভাবে সেল্ফ ডিফেন্স? ঘাড়ে একদম জায়গা বরাবর কলম দিয়ে এমন স্ট্যাব করেছো যে সে হসপিটালে নেওয়ার আগেই মারা গেছেন । কী ভাবো নিজেকে ?

মাহবুব কোন ফাঁক দিয়ে গার্ডের কাছে সিগারেট চেয়েছে সিরাজ সরকার সেটাও খেয়াল করেননি ।

— ভাই, শোনেন তো ।

সিরাজ সরকার বুঝলেন ওনার এই প্রকাশভঙ্গি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়নি । এরমধ্যেই বিরতিতে চলে গেছে । ক্যারিয়ারের জন্য এটা বিরাট একটা স্ক্যান্ডাল হয়ে গেল ।

মোবারক রিপন বলতে লাগল — ভাই, আপনাকে এসব কথা কে বলতে বলেছে ? ২ সপ্তাহ সময় হাতে, আপনাকে কেউ এ ধরনের প্রশ্ন করতে বলা হয়নি ।

সিরাজ সরকার ওয়াসার নোংরা পানির মতো বললেন — হাসান মুস্তাফিজ বাংলাদেশের প্রথম কবি যে টি.এস.এলিয়ট প্রাইজ জিতেছিল ।

— তো কী হয়েছে ? সামনে আরও পাবে । এইসব পুরষ্কার বাংলাদেশের কারোরই যায় আসে না । যেসব প্রশ্নের জন্য ভালো ভিউয়ারস পাওয়া যাবে সেইসব প্রশ্ন করেন ।

— ৩,২,১… 

" একটা প্রশ্ন করি ?" মাহবুব বলল ।

সিরাজ সরকার তাকালেন ।

— মায়ানমার থেকে আর হাতি বাংলাদেশে এসেছে ?

— জানা নেই ।

মাহবুব অপটিমিস্টিকভাবে বলতে লাগল — অন্য দেশের প্রাণীও বুঝে এই দেশের মানুষ অতিথি ভালোবাসে । প্রাণীরা বুঝে অন্য দেশে যা আছে, এই দেশে এসে তার কিছুই পাবে না । তাও আসে । রামপালে ওমন একটা দূর্ঘটনা হল, কিন্তু খেয়াল করেন, ভারত থেকে বাঘ আসা থামেনি । ওদের গলায় আবার ট্র‍্যাকিং কলার পরিয়ে রাখা হয়েছে । কীসব গবেষণা যে তারা করে ।

সিরাজ সরকার এবারও প্রশ্ন করতে পারলেন না কারণ মাহবুব বলতে লাগল — মায়ানমারের সাথে যুদ্ধ হলে খারাপ হয় না । 

সিরাজ সরকার মোবারকের দিকে তাকালেন । সে ইশারা দিচ্ছে চালিয়ে যান ।

সিরাজ সরকার সিম্বলটা ধরতে পারলেন না । বোরিং প্রশ্ন করে ফেললেন — তোমার বাবা, মা কেমন ছিলেন ?

মাহবুব এইবার পা নামিয়ে বসলো । — খুব ভালো মানুষ ছিলেন তারা, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বাবা মা । কোনো অভাবে রাখেননি আমাকে । লোয়ার মিডলক্লাস হয়েও এত শান্তিতে ছিলাম আমরা । বিশেষ করে ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত । তিনবেলার খাবার, সপ্তাহে তিনবার মুরগি সব ছিল । বাবা আমার ওজন কমানোর জন্য একটা ইলিপটিকাল মেশিনও কিনে এনেছিলেন ।

সিরাজ সরকার বললেন — বুঝতে পারছি ।

এইবার মাহবুব সরাসরি তাকিয়ে বলল — আমার বাবা-মা তাদের চাকরির ক্যারিয়ারে জীবনেও একটা টাকা ঘুষ খাননি । ট্যুর করে আমার বাবা তার পুরা শরীর ধ্বংস করে ফেলেছেন । কাজে মনের মধ্যে আমার বাবা-মাকে নিয়ে যা ভাববেন, তা যেন নিষ্পাপ থাকে,

সন্তানের পাপের জন্য দায়ী বাপ-মা নয় কখনো ।

সিরাজ সরকার সাথে সাথে বললেন — আর তোমার বোনেরা ?

মাহবুবও সময় নিল না — তারা আমার দেখা দুনিয়ার সবচেয়ে স্বার্থপর মানুষ । 

সিরাজ সরকার খাতায় এই লেখাটা আন্ডারলাইন করলেন । একটা কোটেশন পাওয়া গেল অবশেষে ।

— এই প্রশ্ন কেন করলেন আমাকে ?

সিরাজ সরকার হেসে ফেলে বললেন — সেটা জানার দরকার আছে তোমার ? আর নিজের ফ্যামিলি নিয়ে কেন এত দুশ্চিন্তা তোমার ? যেভাবে ডুবিয়ে দেওয়া দরকার, সেটা তো তুমিই ভালোমতো করে ফেলেছো । তোমার বোনদের বিয়ে ভেঙে গেছে, পুলিশি মনিটারিংয়ে তাদের জীবন পার হচ্ছে । তোমার ভক্তকুলই তো তোমার বাসায় যেয়ে ঢিল, পাটকেল ছুঁড়ে আসে ।

গার্ড তার হাত ঠোঁটের উপর চেপে বুঝাতে লাগল এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে ।

কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে,

হাসিন মাহবুব বলতে লাগল — এই হচ্ছে আপনাদের উদ্দেশ্য । আপনাদের লাইফ গোলই হল কীভাবে জনপ্রিয় হওয়া যায় সেটা । আপনার কোনো মেধাই নেই যেটার দ্বারা আপনি আমাকে পার্সোনাল এটাক না করে পুরা ব্যাপারটা এককেন্দ্রিক করে আমাকে অন্যদের সামনে তুলে ধরবেন । আপনারা কী মনে করেন, সচেতনার জন্য আপনারা এই ইন্টারভিউ নিচ্ছেন ? আমি বুঝি না কিছু ? এই ইন্টারভিউ আপনারা ছাপাবেন বিনোদন পাতায় । একটা সস্তা নায়িকার পাশে এটা ছাপিয়ে দিবেন । আর সেই ধরনের পশু হয়ে আপনি মনে করেন আপনার অধিকার আছে আমাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার ?

কী ভাবেন নিজেকে ? কেন সবাই আমাকে এমন ভাবে ? কেউ কি চায় না আমাকে বুঝতে ? আমি কি চাইসিলাম নিজেকে গোপন রাখতে ?...

মাহবুব বেশি দুলছিল । শিকল দিয়ে বেঁধে রাখায় দে চেয়ারসহ ফ্লোরে পড়ে গেল । গার্ডরা এই সুযোগ ছাড়লো না । কাঠের ব্যাটন দিয়ে পেটানো শুরু করে দিল ।

সিরাজ সরকার দাঁড়িয়ে বললেন — শালার মাথায় মারেন ।

মোবারক খুব খুশি হল

পরেরদিন মাহবুবের মাথা বেল করে দেওয়া হল । ছয়টা সেলাই লেগেছে ।                

★★★

ঢাকার মোটামুটি সব কাক ভিজে যাচ্ছে । কোনো রান্নাঘরের জানালার কার্নিশে তারা আশ্রয় পাচ্ছে না ।

খিঁচুড়ি আর গরু ভুনা হচ্ছে ।

এক টুকরা গরুর মাংস জীবনের একটা অংশের সমান ।

হাসিন মাহবুব অন্যদিনের চেয়ে আজ একটু নিস্তেজ । বেল মাথা চকচক করছে । পোশাক আর নেই, তাই একটা পাঞ্জাবি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে । এই পাঞ্জাবিটা একজন কুমির ব্যবসায়ীর ছিল ।

সিরাজ সরকার বললেন — কেমন আছো ?

মাহবুব উত্তর দিল না ।

সিরাজ সরকার কনফেশন টাইপ কথাবার্তার তাড়নায় বললেন — তোমাকে কাল যেভাবে এটাক করেছি, সেটা উচিত হয়নি । 

মাহবুব বলল — আচ্ছা ।

সিরাজ সরকার ভেবে দেখলেন ওর সাথে এখনও বাংলাদেশের বর্তমান কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়নি । সেসব আলোচনা করাই যায় । পরে ভেবে নেওয়া যাবে সেগুলো প্রচার করা হবে কিনা ।

জিজ্ঞাসা করলেন — প্রাক্তন আর বর্তমান মেয়রের দুই বছরের রেষারেষি এখনও থামেনি ।    

মাহবুব তাকিয়ে বলল — কারণ মেয়র আনিসুল হক আর নেই । আপনার মনেহয় এখন কোনো বিভাগের মেয়র ওত সাহস নিয়ে বলতে পারবেন " দুই-চারটা লোক বাইরে দাঁড়িয়ে হইচই করলো, আমরা ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলাম । হবে না এটা" কিংবা " একসাথে আসেন । একসাথে দাঁড়াই" । অন্য অংশের মেয়র সেইদিক দিয়ে একটু কালচার । একটা মন্দিরের পূজোতে উনি খুব সুন্দর ঢোল বাজিয়েছিলেন । সেই ভিডিওটা আমার এখনও দেখতে ইচ্ছা করে ।

সিরাজ সরকার পিছনে তাকালেন । মোবারক ইশারা দিচ্ছে চালিয়ে যান ।

সিরাজ সরকার বললেন — তুমি এসব মনে রেখেছো ?

— কাকে ?

— মেয়র আনিসুল হককে ?

মাহবুব একটু কাতরে উঠলো ।

কিন্তু থামলো না । বলল — উনি মারা যাবার পর ওনার কাফনের পাশে যেসব পলিটিশিয়ানরা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের চেহারা আপনি দেখেছিলেন ? সবার চেহারায় মৃত্যুভয়ের চেয়ে জেলাসি বেশি ছিল । তাছাড়া এখনও লোকে কোটেশন দিয়ে বলে " এমন মেয়র আর আসবে না" । এটা সোজা ব্যাপার না ।

ওনার "বাংলায় ৩৫ উত্তর করে ৩৪ পাওয়া" গল্পটা সব টিনেজার এখন জানে ।

তবে ঘটেছে উল্টা, কেউ এখন বাংলা পড়ে না ।

সিরাজ সরকার পারলেন না । ক্যামেরার পিছনের সবাই হেসে উঠলো । এমনকি গার্ডরাও ।

মাহবুব মাঝ দিয়ে পানি চাইলো ।

সিরাজ সরকার সিগারেট অফার করতে যেয়ে থেমে গেলেন । নিজেও আর ধরালেন না ।

সিরাজ সরকার পারমিশন চাইলেন — তোমার নিজের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারি ?

— জি, করেন । 

সিরাজ সরকার কী প্রশ্ন করবেন বুঝতে পারলেন না । কী বিষয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন । মোবারকের দিকে তাকালেন । সেও বুঝতে পারছেন না । উনি শ্বাস নিতে যাওয়ার সময়ে দেখলেন গার্ড বাঁকা করে বুঝাচ্ছে ।

সিরাজ সরকার না ভেবে বলে ফেললেন — মেয়েদের সাথে তোমার ভাব ছিল না কেন ?

মাহবুবকে দেখে মনে হল সে একটু রিলাক্সড হচ্ছে । সে হেসে বলল — হয়েছে কিছু, পরে হয়নি । তারা কবিতা আর ভালোবাসে না ।

— তাই ?

— হ্যাঁ ।

সিরাজ সরকার বললেন — তুমি সবসময় মেয়েদের ব্যাপারে অনেককিছু বলতে তোমার বন্ধুদের কাছে । সেসব কেন বলতে ?

মাহবুব একবার তাকালো । ক্যামেরাটা এবার ফোকাস করা হল । মাহবুবের চোখ একটু ঘোলা দেখাচ্ছে ।

— কী বলব আপনাকে এই বিষয়ে ?

সিরাজ সরকার বললেন — যা তোমার মন চায় ।

মাহবুব একটু নিস্তার পেয়ে বলল — আমি নিজে জনপ্রিয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া ছেলে । কাজে আমি যে জনপ্রিয় ধারায় মেয়েদের মুগ্ধ করতে যাইনি, তা না । আমি চেষ্টা করেছি । কিন্তু পরে দেখলাম, অন্য সবার হচ্ছে, খালি আমার হচ্ছে না । আমি অন্য সবার কথায় নিজের চশমার ফ্রেম কতবার পাল্টিয়েছি হিসাব নেই । মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলে সব বিষয় তাদের কেন্দ্র করে তুলতে হয়, সেটাও আমি করেছি । আবার প্যান্ট একটু নিচে পরা, আর শার্ট ছোট গায়ে দেওয়া, যাতে নিচু হলে দামি আন্ডারওয়্যার দেখা যায় সেটাও করেছি ।  কিন্তু পরে দেখি, তাও হয়নি । মাঝ দিয়ে আমি কিছু ভালো সক্রেটিয়ান গল্প পেয়েছি ।

সিরাজ সরকার বললেন — তোমার কী মনেহয় কেন এমন হল না ?

এবার মাহবুব হা হা করে হেসে উঠলো ।

— জানেন, এই দেশে কোনো বাচ্চার উপর মুরব্বির প্রভাব কখনো ছিল না ।

ছোট থাকতে যখন কারোর বাসায় গিয়েছি, "রাগ কমানোর দোয়া" "বাথরুমে যাওয়ার দোয়া" "ঘুমানোর দোয়া" "বারবার বলুন বিসমিল্লাহ " এসব পোস্টার দেখেছি ।

আমার সাথের এক ছেলে, মতিঝিল কলোনিতে আমরা একসাথে বড় হয়েছি, সেই ছেলে একবার একজন ভদ্রলোক, কমদামের সস্তা প্যাকেটজাত আচার খেয়েছিলেন হয়ত, তিনি লাল থুতু ফেলেছিলেন রাস্তায় ।

ছেলেটা সমস্ত ঘিন্না নিয়ে বলেছিল — ছিঃ,হারাম কাজ করে আসছে ।

সেই ছেলে যদিও এখন সিগারেট খায় না, সিগারেট তো মেথররাও খায় ।

সে খায় এখন দামি দামি ব্র‍্যান্ডের এলকোহল । বাড়ির ছাদ থেকে নামার সময়ে সে ল্যাংচায় পড়ে যাচ্ছিল, এসব হচ্ছে তাদের লোমহর্ষক গল্প ।

তাদের লাইফ বলে বোরিং নয়, তাদের এত ফ্রেন্ড । যখন যেখানে ইচ্ছা তারা যেয়ে ফূর্তি করে আসতে পারে । তাদের রাজকন্যার অভাব নেই ।

অবশ্য তাদেরকে নিজস্ব রাজকন্যাদের সাথে দেখতে ভালোই লাগত ।

সিরাজ সরকার শকড এবং থমকে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেন ।

— তারপর বলো ।

— কাজে আমি দাবি করতে পারি না আমি সবসময় ভালো ছিলাম । আমি এখনো লোভী । কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে আমি নিজের সব ডিসায়ার এখন সাপ্রেসড করতে পারি ।

সিরাজ সরকার বললেন — এ ধরনের আচরণের জন্য কারা দায়ী তোমার মতে ? ফ্যামিলি ?

মাহবুব বলল — দেখেন, ফ্যামিলিতে একটা বাচ্চা সবসময় ঝগড়া বা ফাটাফাটি দেখবে । স্বামী বউকে পিটাচ্ছে তাও দেখবে ।

কিন্তু দেখেন, আমি যখন জন্মেছি তখন কিছু পরিবর্তন এসেছে । নারীদের সম্মানের ব্যাপারটা বউ পেটানো স্বামীও এখন অকপটে স্বীকার করে । সে বাধ্য । কোনো নারী এখন গৃহিণী হতে চায় না । যে করেই হোক সে উপার্জন করতে চায় । স্বামী জানে, ট্র‍্যাডিশন অনুযায়ী মার খাওয়া বউ মাস শেষে তার বেতনের টাকা তার হাতে তুলে দিবে । টাকার মূল্য অনেক ।  

আমি এরজন্য প্রধানত দায়ী করি জনপ্রিয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে । যেমন… 

পানি এসে গেল । পাঁচ মিনিট ব্রেক ।

মাহবুব বলল — কী নিয়ে কথা হচ্ছিল ?

সিরাজ সরকার পিছনে, সামনে তাকালেন । সবাই ভুলে গেছে ।

মাহবুব বলতে লাগল — রাত হলে কলোনিতে সব নাইটগার্ড হুইসেল দিতে থাকত । 

বেতন নিতে আসার সময়ে কার্ডে লেখা — ওত নং সেক্টর কমান্ডার । 

আহারে, সেই যোদ্ধা তারা । ওদিকে তাদের লাঠি কিনে দেওয়ার টাকাই কেউ দিত না ।

গার্ড ছাড়া সবাই হেসে উঠলো ।

সিরাজ সরকার দ্রুত বলে উঠলেন — ওহ হ্যাঁ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বলছিলে…

মাহবুব বলল — আমি হাসান মুস্তাফিজ সাহেবকে কীভাবে খুন করেছি সেটা তো জানতে চাইলেন না ।

সিরাজ সরকার ভেবে বললেন — রিমান্ডে তো বলেছো অনেককিছু ।

মাহবুব মাথা নামিয়ে বলল — আসলে জানেন, হ্যাঁ আমার উদ্দেশ্য ছিল খুন করার । কিন্তু ওনাকে দেখে আমি সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলি । কিন্তু অন্য সবার মতো অটোগ্রাফ নিতে যাই । কিন্তু ওনার বউটাকে দেখে আমি বলে ফেলি — প্রথম ঘরের সন্তানের জন্য তো কিছু রেখে গেলেন না আপনি, সব আপনার আপনার পরের ঘরের সৎ মেয়ে আর ছেলের জন্য রেখে গেলেন । আপনি নিজে ভালোবাসা আর সাম্য নিয়ে কথা বলেন ভিতরে এসব করছেন । আপনার নিজেকে ভণ্ড মনে হয় না ?

আমি বুঝিনি উনি এত ক্ষেপে যাবেন । একটা ঘুষি বসিয়ে দিলেন আমাকে । আরও তো মেরেছেন । আমি খেয়াল করিনি যে আমাকে কলম যে ফেরত দিয়েছেন, ক্যাপ লাগাননি ।

আমি "Casino" সিনেমাটায় দেখেছিলাম কীভাবে কলম দিয়ে মানুষ মারে । কিন্তু সেদিন বাস্তবে প্রথম দেখলাম । আমি নিজেই তো ঘটালাম । এমন জায়গায় মেরেছি যে উনি গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করতে লাগলেন — আমি মারা যাচ্ছি ।

ওনার মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিলো ।

কিন্তু কেউ একটা অ্যাম্বুলেন্স কল করেনি । ওনার বউ চিৎকার করছিলেন ।

এখন দেখেন শেষমেশ দায়ী আমি । দুনিয়ায় কোনো পাবলিক প্লেসে খুনের সময়ে দেখেছেন যে এত মার্ডার রিলেটেড ভিডিও ক্লিপ মিডিয়ায় আছে? কত এঙ্গেল থেকে । জন লেননকে খুন করার এত বছর চলে গেল । সেটারও তো এত নেই ।

সিরাজ সরকার বললেন — তুমি স্বীকার করছো তাহলে যে তুমি খুন করেছো ?

হাসিন মাহবুব চুপ হয়ে গেলেন ।

— আপনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে জানতে চাচ্ছিলেন ।

— হু, বলো ।

মাহবুব হেলান দিতে পারলো না । সেই অংশটাও সে ভায়োলেন্স কাজে ইউজ করতে পারে । 

— যখন টিনেজাররা একাডেমিক প্লেসে যায় সেটা ঐ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তাকে মানবিক করা ।

এইযে, মতিঝিল, ময়মনসিংহ, শ্রীমঙ্গলের যে নামকরা উচ্চ-মাধ্যমিক কলেজ, একমাত্র কলেজ যেটা এখনও দেশে ভর্তি এক্সাম নেয়, তারা জরিপ করে দেখেছে, কত ছেলে তারা এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রডিউস করেছে যারা রেপিস্ট, ওয়াইফ-বিটার, দুর্নীতিবাজ আর খুনী ?

সিরাজ সরকার বললেন — তুমিও তো সেখানকার । 

— হ্যাঁ, আমিও তো ঐ গ্রুপে পড়ি ।

আপনি নিজে ভেবে দেখেন, গত ৮ বছরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে যত ছেলে বের হয়েছে সেখানে কত খুনী ছিল ।

ভেবে দেখেন, ক্যাম্পাসে থাকাকালে তারা একটা ছাত্রকে হোস্টেলে পিটিয়ে মেরে ফেলল । এখন ক্যাম্পাসে মারামারি করে ছাত্র আহত হবেই । রোনাল্ড রিগ্যান যখন ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়র ছিলেন তখনও এমন হয়েছিল ।

ওনার রেসপন্স উক্তিটা আপনার জানা আছে ?

সিরাজ সরকার আফসোস করে বললেন — না ।

— আমার কিন্তু ওনাকে ভালো লাগে । আমারও মনে নেই ।

যাই হোক, তো সেটাই আরকি । আচ্ছা, খুনের ব্যাপার তো গেল । এখন আসেন অন্য বিষয়ে ।

আগে যখন মফস্বল বা গ্রাম থেকে ছেলেরা সেই কলেজে পড়তে আসতো, তাদের একটা লক্ষ্য ছিল । তাদের লক্ষ্য থাকত তারা কীভাবে একজন প্রধান সারির ইনটেলেকচুয়াল হবে । কিন্তু এখন এসে তারা যত ধরনের সস্তা সব ক্লাবে বা সংঘে ঢুকে । এবং তারা মডার্ন হ্যারাসমেন্ট এত সুন্দর করে এডপ্ট করে রে ভাই ।

কত মেয়ের পবিত্র ভার্জিনিটি তারা নষ্ট করেছে । এরা জানোয়ার। এদের বাপ মরলে আমার কষ্ট লাগে না । আমার ক্লাসমেটদের কথাই ভাবেন । আমরা দুই বছর আর ডিপ্রেশনের প্রথম ছয়মাস ওদের সাথে অনেক ভাব ছিল । পরের দুই মাসে আমি যখন ওদের নিজ দিক থেকে জবাবদিহি করার সবধরনের ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি, আমি তখন সবার অপ্রিয় হয়ে যাই । এসব শুয়োরদের মধ্যে একটা কনসেপ্ট হচ্ছে, প্রাইভেট ভার্সিটিতে খালি সেক্স হয় । বুঝতে পারছেন এরা কত নির্লজ্জ ? তারা ঐ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, মা নিয়ে তারা অনেক কিছু শুনেছে সেখান থেকে ।

তারা এসব নিয়ে ফান করে ।

এখন একটা মেয়ের জেলডা বড়, জিনেরভা ছোট এটা নিয়ে ফান করা হয়ত যায় । শারীরিক ডিফোর্মেটি অনেক ক্ষেত্রে ফান করার মতোই । কিন্তু যখন আপনি সেক্সুয়ালিটি আর নিজেকে বিক্রি দেওয়াকে তাচ্ছিল্য করছেন, বুঝতে হবে সে দোযখের পাঙ্ক ।  

এরকম এক ছেলের জন্যেই অরোরা বুঝতে পারেনি আমি ওকে কত ভালোবাসতাম ।

সিরাজ সরকার এড়াতে পারলেন না । "অরোরাকে" ।

মাহবুব মুচকি হেসে উঠলো । বলল — শুনবেন নাকি ?

— বলো  ।

প্রশান্তি নিয়ে মাহবুব বলতে লাগল — একটা মিসম্যানেজমেন্টের মধ্যে দিয়ে ওর সাথে আমার পরিচয় । কিন্তু বুঝলেন আমাদের ক্লিকটা সেই ছিল । যখন আমাকে কেউ বুঝেনি, আমার কবিতা ভালো ছিল না, তখন ঐ ছিল একমাত্র যে আমাকে দয়া করেছিল ।

প্রতি রাতে সে ম্যাসেজ দিত কিছু লিখেছি কিনা ।

উত্তর নেগেটিভ হলে সে ফোন দিতেই থাকতো । যতক্ষণ না আমি লিখে ওকে না দেখাতাম, ও ছাড়তো না আমাকে ।

মাঝে মাঝে ও ফোন দিয়ে বলত — ভয় লাগছে ।

বলে কান্না শুরু । মা নেই যে । মাকে মনে পড়ে এবং সব ধরনের স্মৃতি সে আমাকে বলতো ।

কিন্তু ওকেও আমি পাইনি ওভাবে । কারণ সেও জানোয়ারের পাল্লায় ছিল । খেয়ে ছেড়ে দিসে ওকে ।

সিরাজ সরকার জিজ্ঞাসা করলেন — পরে পাওনি ?

মাহবুব আনন্দ নিয়ে বলল — পেয়েছি তো । একমাস আমরা ছিলাম একসাথে । জানেন, জানকে নিকনেমে ডাকা এই প্রসেসটা এখনও আছে । কিন্তু ওকে আমি বলে এত সুন্দরভাবে অরোনা ডাকতাম যে ও বলতো আমি যেন আর ওকে অন্যকিছু দিয়ে না ডাকি ।

সেই গ্রেইট ডিপ্রেশনের টাইমে আমি অসুস্থ শুনে আমার প্রিয় খাবার লাল শাক ও রান্না করে নিয়ে এসেছিল ।

আইরিশ কমেডি নিয়ে আগ্রহ দেখে আমাকে দামি মোটা পুরা আইরিশ কমেডি কালেকশন কিনে দিয়েছিল ।

বুঝলেন, আমার নারী খেতে ইচ্ছা করে না, পান করতে ইচ্ছা করে ।

ওর মাধ্যমেই সেই তৃষ্ণা আমার প্রথম মিটে । একটা রেস্টুরেন্টে আমি ওর জেলডা আর জিনেরভা চুষে দেখেছিলাম । আমার বাম কানটায় ও যে পালিশ দিয়েছিল ।

আমার ছোট পামেলা পর্যন্ত জেগে উঠেছিল ।

কিন্তু জানেন, আমার ওর ফ্যানি একবারও ধরতে ইচ্ছা করেনি । কারণ সেটা খাওয়া, পান করা নয় ।

আমার এই সততা ও ভালোবাসতো ।

— পরে ?

— পরে তো আর টিকলো না । কিন্তু যখন টিকলো না আমি ভেবে দেখলাম আমি নিজের সব আদর্শকে অস্বীকার করেছি ।

আমি ভেবে দেখলাম সেই মফস্বলের জানোয়ারদের চেয়েও আমি কত বড় শয়তান । আমি জানি এসব ঠিক না, অথচ আমি নিজেকে সেসবে বিলিয়ে দিয়েছি ।

ভেবে দেখেন আমি কত অভাগা । বাংলার তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার নারীদের নিয়ে বিভিন্নভাবে লিখেছে । এখন ধরেন তাদের লেখায় বেশ্যা, জমিদাররা নৃত্যশিল্পীদের সাথে কী ছিল লিখেছেন । কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল সম্মান বৃদ্ধি করার । আর আমরা নিলাম যে আচ্ছা এভাবে তাহলে পাওয়া যায় ।

এখন ভেবে দেখেন এই মানসিকতার মানুষরা এখন লেখক হচ্ছে ।

আমিও সেই পর্যায়ের । এরপরেই অবশ্য আমি আবার সেই বাচ্চাকালের খঁজ উপায়ে মেয়েদের সাথে কথা বলা শুরু করি ।

জোর করে তাদের গল্প, কবিতা দিতাম । তখন আমি খুঁজে পাই স্মিতাকে ।

সিরাজ সরকার এইবার হেসে বললেন — হ্যাঁ জানি, হাসান মুস্তাফিজ পর্ব শেষ করে তো তুমি ওর বাসার সামনে যেয়ে জোরে জোরে নাম ধরে ডাকছিলে ।

মাহবুব হেসে ফেলে বলল — আমার সবসময় একটা ফ্যান্টাসি ছিল " A streetcar named desire " সিনেমাটার একটা দৃশ্য সুযোগমতো কপি মারব ।

সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম ।

সবাই হেসে দিল । 

সিরাজ সরকার বললেন — আচ্ছা, তারপর ?

মাহবুব সংকোচ করে বলতে লাগল — তারপর তো ভাই ( খুব কানে লাগল এটা সিরাজ সরকারের) সব এম্বেরেসিং ঘটনা । মেয়েটা আমার চেয়ে ভালোই ছোট । সেইজন্যেই ওর পবিত্রতায় আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল অনেকে মডার্নিজম নিয়ে অনেক কিছু বলা সত্ত্বেও ।

বুঝলেন, ম্যাসেজ দিতাম , প্রথম তিনদিন উত্তর দেয়নি । কিন্তু আমি যেদিন বাংলাদেশের একজন প্রধান কবিকে নিয়ে একটা সমালোচনা ওকে পড়তে পাঠাই, সেদিন ও উত্তর দেয় । ঐটাই আসলে আমার শেষ লেখা যেটা দৈনিক পত্রিকায় বের হয়েছিল, আবার প্রথম ।

এরপরে বাংলাদেশের কোনো শুয়োর নোয়াম চমস্কির সাথে যা করলো, সেটা নিয়েও কথা বললাম । ভালোই লাগত ।

পরে জানলাম ও আমার এক ক্লাসমেটের ছোটবোন । তাকে আবার আমি ভয় পাই । তার রাজনৈতিক মতাদর্শ আমি রেসপেক্ট করি কিন্তু পুরা সাপোর্ট করতে পারি না । কিন্তু মেয়ে আমার প্রতি নরম ও দয়ালু ছিল ।

এখন বুঝেনই তো, মডার্ন যুগ, সেই তালে চলা লাগে । মেয়েকে ইমপ্রেস করার জন্য আমি এনিমে দেখতে শুরু করি, যদিও আমার এসব সহ্য হত না । টোটাল বোরডাম মনে হত ।

স্মিতাকে দেখানোর ইচ্ছা ছিল আমি মানুষটা ভালো । আমি সে আসলেই মেয়েদের ওভাবে স্বর্গের হুর ভাবি । তাই ঠিক করি ওকে রেমন্ড কার্ভারের স্টোরি কালেকশন গিফট করব ।

কিন্তু ভাই (খুব লাগে কানে) দুনিয়া যে এত জঘন্য, এখন তো ঢাকাও খুব ময়লা দেশ । বৃষ্টি পড়লে সেনসরি গন্ধের চেয়ে গলি থেকে গলির গুয়ের গন্ধ বেশি পাওয়া যায়। এতই পেট খারাপ এই দেশটার । আবার বসবাসের যোগ্য নয় এমন তালিকায় তো ঢাকাই এইবার প্রথম হল ।

মানে যাই হোক, আমাকে চিনে না তাই সে নিবে না । কাজে চেনানোর একমাত্র উপায় হল এনিমে দেখা । কড়া এনিমে দেখতাম।যত ধরনের । ওর সাথে যখন এসব কথা বলতাম খুব জমতো আসরটা ।

সেই থেকে আমি বুঝি, মেয়েটার বোধশক্তি আছে । যে এনিমে এত জনপ্রিয় এবং মানুষ অন্ধভাবে সেটার সবকিছুর প্রশংসা করে সেখানে মেয়েটা আমাকে এভাবে বলতো যে এইখানে এই ভুল, এই দৃশ্য ভালো হয়নি, এই এন্ডিং ভালো হয়নি ।

বলেন, আমার মতো একটা ছেলেকে তেজস্ক্রিয় করে দেওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট নয় ?

মাহবুব উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে । সিরাজ সরকার মাথা নাড়লেন ।

মাহবুব বলতে লাগল — সো, আমি বুঝে যাচ্ছিলাম যে আমাদের দেখা হবে । ওদিকে আমি ওর কিছু ক্লোজ মানুষদের রাজনৈতিক কনসেপ্ট নিয়ে জ্ঞানার্জন করে ফেলেছিলাম ।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে ওর জন্মদিন ।

আমি দাওয়াত পাই । 

" উফ" ক্যামেরার পিছন থেকে শোনা গেল ।

সিরাজ সরকার থামলেন না । জানতে চাইলেন — তারপর ?        

— এরপরেই তো মগবাজারের আড়ং উড়ে গেল ।

এবার সবাই নড়েচড়ে উঠলো ।

মাহবুব বলল — জানতে চান ?

— হু অবশ্যই ।

এটা সবাই বলল 

— আড়ংয়ের কয়েক বিল্ডিং পরেই অরোরার বাসা । ভাই বুঝলেন ( এখন সুন্দর লাগছে)... 

সিরাজ সরকার থামিয়ে দিলেন — এই দাঁড়াও, তাহলে তুমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলাকে একভাবে দোষারোপ করছো ?

মাহবুব অকপটে বলল — টিচার রেপ করার পরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দায় নেয়নি, এমনকি সুইসাইডের পরে, ৫৩ বছর হয়ে গেছে । কাজে হ্যাঁ, দায়ী করি ।

আচ্ছা, আমার ব্যাংক একাউন্টে কত টাকা আছে জানেন ? মুনাফা ছাড়া ?

— দেখে আসব নে, হু তো মগবাজার ?

মাহবুব আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল ।

— ভাই ( কী মধুর), হয়েছে ছাড়াছাড়ি, কিন্তু ভালোবাসি, এখনো যে । ওর সাথে আমি সবসময় ওরসন ওয়েলসকে নিয়ে আলাপ করতাম । আমি কেমনে ভুলি এসব ? 

আমি জানার পর থামতে পারিনি, কতভাবে ওর কাজিনদের ম্যাসেজ দিয়েছি । নম্বর আর একাউন্ট এসব দিয়ে তো সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে না মানুষটার সাথে, নিয়মে নেই ।

পরে আমি সেই রাতে মগবাজার চলে যাই, যেয়ে দেখি রাস্তা বন্ধ । ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ দিয়ে ভর্তি । তাই গলিতে ঢুকে পড়ি । ওর বিল্ডিংয়ের সামনে আমার যেতেই হবে । ঢুকে দেখি সব রেস্টুরেন্ট মোমবাতি জ্বালিয়ে ব্যবসা করছে, কী লোভ ।

রেললাইন পেরিয়ে অবশেষে ওর বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছাই । না, অন্যান্য সব বিল্ডিংয়ের গ্লাস পর্যন্ত ফেটে যায় ওমন বিস্ফোরণের শব্দের জন্য, কিন্তু সেই বিল্ডিং ঠিক আছে, খালি বিদ্যুত সংযোগ বন্ধ । হায়রে ভাই ( একটু বেমানান) কীযে শান্তি লাগসিল । কিন্তু ফোন চেক করে দেখি ওর মামাতো বোন ম্যাসেজ দিয়ে রাখসে ও ঠিক আছে কিন্তু আমি যেন আর এসব না করি আর যোগাযোগের চেষ্টা না করি ।

আপনিই বলেন, আমি কি এত খারাপ ছিলাম ? এই ধরনের ট্রিটমেন্ট আমার ভাগ্যে ছিল ? আমার দোষটাও কেউ আজপর্যন্ত… 

সেইদিনই আমি ঠিক করি হিচহাইক করব । বাবার মানিব্যাগ থেকে সব টাকা সরিয়ে ফেলি । হ্যাঁ, হাসান মুস্তাফিজের দালালির প্রতি প্রতিশোধ...

মোবারক বলে উঠলো — ভাই ক্ষিধা লাগসে ।

সিরাজ সরকার বললেন — আমি আবার আসব । 

সেটা আমাদের শেষ দেখা হবে ।

★★★

মাহবুব আজ অনেক হাসিখুশি । জেলের পোশাকে ফিরে গেলেও সে আজ শেভ করেছে ।

সিরাজ সরকার জিজ্ঞাসা করলেন — কেমন আছো, হাসিন ?

মাহবুব নেড়ে উঠে বলল — হাম একদাম ফার্স্ট ক্লাস হে, হাম বাংলাদেশি হে ।  

আচ্ছা, শুনলাম বাংলাদেশে বলে প্রথম ফিমেইল সিরিয়াল কিলার খুঁজে পাওয়া গিয়েছে ?

সে বলে আমাকে বিয়ে করতে চায় ?

সিরাজ সরকার কানে তুললেন না ।

বললেন — অরোরার খবর এনেছি ।

মাহবুব বললেন — ভাই, ঘিন্নার কথা আর কত তুলবেন ? বাদ দেন না, স্মিতাকে কীভাবে বই দিয়েছিলাম শুনবেন ? শালার ওয়েটার আমার…

সিরাজ সরকার জোর দিয়ে বললেন — হাসিন, তোমাকে শুনতে হবে ।

মাহবুব হতাশ হয়ে বলল — আচ্ছা, বলেন ও আমাকে কতখানি ঘিন্না করে ।

— সেই সুযোগ নেই, ও মারা গেছে ।

হাসিন মাহবুব, মুখ হাঁ, পায়ের স্যান্ডেল খুলে গেছে, তাকালো ।

সিরাজ সরকার বলল — রিমান্ডে তো তুমি ওভাবে বলোনি, তাই পুলিশ আর খোঁজ নেয়নি । আমি ইনভেস্টিগেট করেছি ব্যাপারটা । ও আড়ংয়ে ছিল । ধানমন্ডিতে ওর মামির বাসায় ও বলে আসে যে বন্ধুদের সাথে নিউমার্কেট যাচ্ছে । সেখান থেকে ও কীভাবে মগবাজারের আড়ং গেল জানি না । মূলত ও সেখানেই ছিল ।

বিস্ফোরণের দুই মিনিট আগেও অরোরা ওর মামিকে ফোন দিয়ে বলেছিল সে নিউ মার্কেটে । একরাত পরেও ও বাসায় না আসলে পরে ফ্যামিলি পুলিশের কাছে যায় ।

গতকাল ঘোষণা করা হয়েছে, ও মৃত । যেই জায়গায় বিস্ফোরণ হয়, ও সেইখানেই ছিল, ডিএনএ টেস্ট তাই বলে ।

হাসিন মাহবুবের হাত বাঁধা শিকল দিয়ে চেয়ারের সাথে । মুখ ঢাকার সুযোগ নেই ।

কান্না সবাই দেখবে ।

অনেকক্ষণ পর, বলল — মামি না, ও ডাকতো মামিমা বলে ।

ভদ্রমহিলা ওকে খুব আদর করতো ।

মাহবুব বলতে লাগল — মেয়েটা আমাকে আসলেই শ্রদ্ধা করতো ।

আমিই ওকে বলেছিলাম ওর হিজাবের ব্যবসায় যে কাপড় ইউজ করে সেটা চেঞ্জ করতে, আর সাথে অন্যান্য প্রোডাক্ট যদি পারে…

আমি আড়ংয়ের ডিজাইন দেখে আসতে বলেছিলাম । 

হায়রে, আমার কথা শুনেই মরলো ।

সিরাজ সরকার বললেন — না দেখো আসলে…

হাসিন মাহবুব না শুনেই বলল — জানেন রুমির একটা কবিতা আছে ।

কেউ যদি অন্য কাউকে আল্লাহ এবং নিজেকে ছাড়াও সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, আল্লাহ সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে নিজের কাছে নিয়ে নেন ।

ও মারা গেল আমার জন্য ।

এইবার হাসিন মাহবুব পুরাপুরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল — হ্যাঁ, আমি খুনী । আমি অরোরাকে নিজে খুন করেছি ।

মোবারক বলে উঠলো — কাট, কাট । 

ঠিকই বিনোদনের পাতায় ওর ইন্টারভিউটা প্রকাশিত হয়েছিল । নায়িকা ভিক্টিমটি কোনো অভিযোগ করার সুযোগ পায়নি । পুলিশ ততদিনে সব কাল্ট মুভমেন্ট দমন করে ফেলেছে । বাংলাদেশের প্রথম বাংলাদেশি ফিমেইল সিরিয়াল কিলারের ফাঁসিও হয়ে গেছে ।

ইন্টারভিউটার শিরোনাম ছিল — " হ্যাঁ, আমি খুনী"

অরোরা বা স্মিতার কোনো অংশই দেওয়া হয়নি । এডিট করেছেন সম্পাদক ।   

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন