গল্প
লুটের রাজত্ব
সৌমিত্র চৌধুরী
ডান হাতে প্লাস্টিক-মোড়া ছোট্ট প্যাকেট । চামড়ার হাল্কা ব্যাগ বাঁ-কাধে । বাজারের ভারি ব্যাগটা নিয়ে পেছন পেছন আসছে ড্রাইভার । ব্যালকনি থেকে দেখতে পেলাম ।
এবার উঠে দরজা খুলবো । ব্যালকনি থেকে লাঠি ঠুকে ঠুকে ভিতর ঢুকলাম । বেশী হাঁটাচলা করতে পারি না আজকাল । মাঝে মাঝে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ি । ফ্ল্যাটেই থাকি । কোমরে বাত, সঙ্গে হাঁটুর ব্যাথা । বাইরে যাবার ক্ষমতা নেই । মেয়েও বিদেশে । বাজার ব্যাঙ্ক বাড়ির গাদা কাজ সরমাকেই সামাল দিতে হয় ।
দরজা-ঘণ্টির টুং টাং । সোফায় বসেই বললাম, ‘খোলা আছে ।’
ভারী পাল্লা ঠেলে গদি আঁটা চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসল সরমা । ড্রাইভার ভারী ব্যাগটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে বেরিয়ে গেল । হাতে ধরা বাহারি গোল প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরল সরমা । কোন ট্রফি জিতে এসেছেন যেন । এক মুখ হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘দারুণ জিনিষ পেলাম ।’
-কী জিনিষ ? সামনে ঝুঁকে জানতে চাইলাম ।
-হাতে নিয়েই দেখ না !’ খুশী মনেই বললেন সহধর্মিণী ।
শপিং মলের বাহারি প্যাকেট । গায়ে সাঁটানো দামী স্টিকার । তাতে যাবতীয় তথ্য । লাইসেন্স নম্বর, সংরক্ষণের সঠিক তাপমাত্রা । জিনিষটার ওজন আধা কিলো, দাম তিনশ টাকা ।
-কী এটা ?
-দারুণ জিনিষ ! বাজার তো করো না ।
করতে পারি না । কথা তো শুনতেই হবে । খানিক চুপ থেকে স্বর নরম করে আবার জানতে চাইলাম, ‘বাজার থেকে কী আনলে ওটা ?’
-বাজার নয় । শপিংমল ।
-ওই হল । কী আনলে ?
-ক্যাবেজ, ক্যাবেজ । ভালো করে দেখ ।
-ক্যাবেজ ? মানে বাঁধা কপি ।
-হ্যাঁ । এসময় পাওয়া যায় না । দাম বোধ হয় একটু বেশি ।
-তা বলে ছ’শ টাকা কিলো?’ মুখ ফস্কে কথাটা বেরিয়ে গেল ।
-হবে না ! শীত পরেনি । দুর্গা পূজোর আগেই ক্যাবেজ খাবে । দাম দিতে হবে তো !
মুখের কথা আটকে গেল । ছ’শ টাকা কিলো ? স্ত্রীর সাথে তর্ক করতে পারি না । নিজের চাকরি সামলে বাড়ির যাবতীয় কাজকর্ম তিনিই করেন । আমি অথর্ব লোক । কী বলব ! গৃহ শান্তি বজায় রাখতে অনেক অপ্রিয় অভিযোগ মেনে নিতে হয় । আমি মুখ বন্ধ রেখে সোফায় কাত হয়ে বসে রইলাম ।
-কথা বলছ না কেন ?
না-বললেও মুশকিল । একটু হেসে ঢোঁক গিলে বললাম, ‘খুব ভালো । খুবই ভালো করেছো ।’ তারপর আগের মতই একই ভঙ্গিমায় আমি স্ট্যাচু ।
চেয়ার থেকে উঠে অন্য ঘরে গেল সরমা । কাজের মাসী আসবে । এখানে বলে ‘বাই’ । তরকারি কেটে দেবে বাই । সরমা রান্না করবে । আর আমি বসে থাকবো চুপ করে । ভাবতে থাকবো দরকারি অদরকারি অনেক কিছু ।
বিষয়ের কী অভাব আছে । ভাবনা চলছে । আর মাথার চারদিকে একটা মাছি ভোঁ ভোঁ চক্কর কাটছে । তাড়িয়ে দিলেও ফিরে ফিরে আসছে । একটাই সওয়াল । ক্যাবেজ । ছশ টাকা কিলো ?
-চা খাবে নাকি ?’ কিচেন থেকে আওয়াজ ভেসে এল ।
-কষ্ট না-হলে দাও ।
-কষ্টের কি আছে ? অন্য দিন যেন দিই না ।
আমি নিরুত্তর । মাথার ভিতর ঘুরছে পোকাটা । ফরফর আওয়াজ । ক্যাবেজ কিলো ছশ টাকা । সরমার হাতের বাঁধাকপিটা হাঁফ কিলো । মানে তিনশ টাকা !
প্রশ্ন উঠছে, ডুবছে । শপিংমল বাঁধাকপি বিক্রি করছে । কিলো প্রতি ছশ টকা ! এ’তো ইউরোপকে হারিয়ে দেবে । কয়েক বছর আগে কৃষি দফতরের বিজ্ঞানি হিসাবে একটা বক্তৃতা দিতে জার্মানি গেছিলাম । নিউরেনবার্গ শহরে দেখলাম দুটো কলার দাম এক ইউরো । মানে সত্তর টাকা ।
আর এখানে বাঁধাকপি ছ’শ টাকা ! আশ্চর্য ! কত দামে কিনেছে এরা ? উত্তর প্রদেশ লাগোয়া দিল্লীর এই দিকটাতে ছোটখাট বাজার নেই । সবই বড় বড় শপিং মল । মাছ থেকে মোবাইল, কপি থেকে কম্পিউটর সবই পাওয়া যায় । দাম বেশী, সবাই জানে । তাবোলে এতটা ?
অস্থির লাগছে । দশ-বিশ কিলোমিটার দূরে গ্রামে গিয়ে একটু খোঁজ নেবো, ক্ষমতা নেই । শরীর অচল । চলাফেরা করতে না-পারলে মনকেও গিলে খায় বিষণ্ণতা । অদ্ভুত এক কষ্ট । একাকী সহ্য করতে হয় । আজ বিষণ্ণতার পর্দা ঠেলে মনের মধ্যে খোঁচা মারছে অন্য ভাবনা ।
চাষিদের কাছ থেকে কত দামে কিনেছে এরা ? প্রশ্নটা ঘুরছে । অবসর নেবার পর আরেকটা বড় রোগে ধরেছে । একটা খিঁচ মাথায় ঢুকে গেলে নিস্তার নেই । ওটা কখনও মাছি, কখনও ভিমরুল হয়ে গুণগুণ করতে থাকে । শেষ না-দেখে নিস্তার নেই । আসল দামটা গুগুলে খুঁজলাম । লিখছে, তিনশ টাকায় এক কিলো ।
বলে কি রে ! দু’বছর আগে তখন সদ্য অবসর নিয়েছি । বর্ধমান সদরে দেখছি একটা বড় বাঁধাকপি বিকোচ্ছে পাঁচ টাকায় । আমার সঙ্গে ছিল ভাগ্নে খোকন । বলল, ‘মামা গাঁয়ের দিকে আরও সস্তা ।’
খোকন এখন স্কুলের মাষ্টার । যখন-তখন ফোন করলে ধরে না । তবু ফোন করলাম । পেয়ে গেলাম একবারেই । জানলাম আজ ওর ছুটি । প্রশ্নটা করতে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল খোকন । এত কথা থাকতে কপির দাম শুধোচ্ছে মামা ! কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি বিভাগের প্রাক্তন অফিসার । এখান থেকে কপি কিনে দিল্লীতে বিক্রি করবে নাকি ? খোকনের প্রশ্নের জবাব দিয়ে আবার জানতে চাইলাম । ও বলল, ‘এখন অল্প অল্প উঠছে বাজারে । দাম একটু বেশী ?’
-কত দাম বলো না তুমি !
একটু থেমে কাউকে জিজ্ঞেস করে ও বলল, ‘চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা কিলো ।’
-ঠিক আছে খোকন । তুমি কাজ কর । পরে কথা বলবো ।’ ফোন রেখে দিলাম ।
হঠাৎ ভুরভুরি কেটে মাথায় ভেসে উঠল রতনের মুখটা । প্রবাসী বাঙালি বনে গেলেও বঙ্গের অনেকের সাথেই যোগাযোগ আছে । মালদার বন্ধু রতনের সাথে প্রায়ই কথা বলি । ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপেও সংবাদ চালাচালি হয় । গোলাপট্টি পাঠশালায় এক সাথে পড়েছি । শরীর স্বাস্থ্য ভালো রতনের । এদিক-সেদিক বেড়াতে যায় এখনও ।
সকাল দশটায় আমার ফোন পেয়ে মালদাইয়া রতন হাসতে হাসতে বলল, ‘কি বে, এত সকালে ফোন করছিস ?’
-শোন্ না, দরকার আছে ।
-বল বন্ধু ।
-ওখানে বাঁধাকপি উঠছে ?
-ব্যবসা করবি নাকি ?
-দামটা বল না! বাজার-টাজার করিস তো !
-রোজ করি । কাল চিত্তরঞ্জন মার্কেটে দেখলাম খুব চড়া দাম ।
-কত দাম, বল না !
-আশি টাকা কিলো । তবে গ্রামের দিকে সস্তা । হবিবপুর, মঙ্গলবাড়ির হাটে পঞ্চাশ টাকা । চাষিদের ক্ষেতে গিয়ে কিনলে পনের-কুড়ি টাকা ।
‘ঠিক আছে রতন’ । ফোন রেখে দিতেই মুলচাঁদের কথা মনে পড়ল । হাতড়াসে বাড়ি । অবসরের পরে চাষবাস নিয়েই থাকে ।
-মুলচাঁদজী, ওখানে বাঁধাকপি উঠছে? কী দাম ?’ হিন্দিতে প্রশ্ন করলাম,
-দাদা, দাম বহুত জ্যাদা ।
-কত ?
-সত্তর আশি রুপেয়া পার কিলো ।’ উত্তর শুনে নিয়ে দু-একটা কথা বলে ফোন রেখে দিলাম । আরও বলবার ইচ্ছে ছিল । পুরনো সহকর্মী । কথা কি আর শেষ হয় । কিন্তু থামতেই হ’ল । চা হাতে নিয়ে সামনে সহধর্মিণী । ফর্সা ভরাট মুখটায় লেপটে আছে বিরক্তির কালচে পোঁচ । গলা উচিয়ে বলল, ‘চা খেয়ে উদ্ধার কর । কাজ নেই তো খই ভাজ্ । হঠাৎ বাঁধাকপি নিয়ে গবেষণা শুরু করল !’
একটু থেমে আবার । ‘আমার বাপের বাড়িতে তো একটু ফোন করতে পারো । মা’র শরীরটা ভালো নেই । একটু খবর নিতে পারো না ?’
-নেবো, নেবো ।’ । চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম । একটু পরে ফোনে ধরলাম হেমন্তকে । অবসরের পর চলে গেছে নিজের বাড়ি, আসামের মঙ্গলদই । ওর ফোন বাজতে বাজতে কেটে গেল । একটু পরে ও নিজেই ফোন করল । আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হেমন্ত, তোমার ওখানে বাঁধাকপির কি দাম ?’
‘অনেক দাম দাদা । আমি তো কিনি না । দাম পড়ুক, তারপর কিনবো ।
-আমাকে দামটা বল না ভাই ।
তখনই বলল না ও । খানিক পরে সম্ভবত বাজার থেকে ঘুরে এসে বলল, ‘এখানে সত্তর টাকা, একটা বড় বাঁধাকপি’ ।
-ঠিক আছে, পরে ফোন করবো ।’ মোবাইল সেটটা টেবিলে নামিয়ে রাখলাম ।
-সকাল থেকে বাঁধাকপি নিয়ে পড়লে । আমি ঠকেছি বেশ করেছি । নিজের টাকায় খুশিমত একটু কেনাকাটা করতে পারবো না ?’ সরমা গজগজ করছে ।
পারবে পারবে, মনে মনে বললাম । সরমা এখানকার লেডিস সার্কেলের সভাপতি । স্থানীয় এক বেসরকারি কলেজে দর্শনের অধ্যাপিকা । জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেছে । কলেজ ওকে ভালোই মাইনে দেয় । দু’হাতে কেনাকাটা করে । ওসব নিয়ে কখনই কিছু বলি না । আমি ভাবছি । মুখে কথা নেই । তবু সরমা ফোঁস করে উঠল । গলায় ঝাঁঝ নিয়ে আগের কথাটাই কেটে কেটে বলল, ‘ঠকেছি বেশ করেছি । তুমি কোন দিন ঠকোনি ?’
-ঠকেছি । পচা মাছ কিনে কতবার ফেলে দিতে হয়েছে ।
-তবে ! আর আমি ঠকলেই গবেষণা শুরু করে দাও !
কী বলবো ভাবছি । একটা বেফাঁস শব্দ বেরোলই কথার তিরে শুইয়ে দেবে ও । অনেক ভেবে শব্দ চয়ন করে বাক্য গঠন করলাম । স্বরে মধু মাখিয়ে ধীরে ধীরে বললাম, ‘তুমি ঠকোনি গো । হাজার হাজার লোক যারা শপিংমল থেকে জিনিস কিনেছে, সবাই ঠকেছে ।’
-মানছি না ।’ সরমা ফোঁস করে উঠল । ‘পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটা জ্যাকেট কিনলে গত বছর । আমি কিছু বলিনি ।’
মুখ নামিয়ে বসে রইলাম । তিরিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে কখন কোথায় কতবার ঠকেছি তার ফিরিস্তি শুনে যাচ্ছি । নাগাড়ে শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়লাম । বাঁধাকপির দাম নিয়ে কেন যে কথা বলতে গেলাম ! সরমার বিগড়ে যাওয়া মেজাজ স্বভাবিক হচ্ছে না । বলে চলেছে, ‘কিনেছি, বেশ করেছি। সরকারি সিলমোহর লাগানো । প্যাকেটে ন্যায্য দাম লেখা । ঠকেছি, বেশ করেছি.. ।’
আরও কিছু বলতে চাইছিল সরমা । আমার মোবাইল মোবাইল ফোনটা বাজতেই মুখ বন্ধ করল । ফোনের ওপারে খোকনের স্বর । ‘মামা এখানকার গ্রামে চাষিদের কাছ থেকে বাঁধাকপি কিনছে এক অল ইন্ডিয়া কোম্পানি । দাম দিচ্ছে কিলোতে পাঁচ টাকা ।’
খুব জোরে জোরে কথা বলে খোকন । সরমা বোধহয় শুনতে পেয়েছে । আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে খোকনকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাদের ওখানে কপির কত দাম বললে ?’
-মামী, আমাদের এখানে চার-পাঁচ টাকা ।’ আমি শুনতে পেলাম খোকনের স্বর ।
-চার-পাঁচ টাকা কিলো !’ সরমার স্বরে বিস্ময় ।
-এক কিলো ফলাতে খরচ কত ?’
-সারের দাম লেবার কস্ট ধরলে, পাঁচ টাকার অনেক বেশী ।’ খোকন একটু সময় নিয়ে বলল ।
ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল সরমা । খানিক অন্যমনস্ক । চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেল । মুখের ভাব বদলে গেল ওর । ক্রোধ বিরক্তি সরে গিয়ে শুধুই বিস্ময় । চোখ বড় বড় । ঠোঁট কাঁপছে । কপালে ভাঁজ । খুব রেগে গেলে এরমক হয় ওর । নিজিকে একটু সামলে নিয়ে সরমা বলল, ‘তার মানে এখানে একশ গুণ বেশী দামে বিক্রি হচ্ছে ?’
-একশ গুণ কেন, আরও বেশী ।’ আমি ধীরে ধীরে বললাম ।
-রাইট, রাইট? ঠিক বলছো তুমি ।’ সরমা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ।
একটু পরে হঠাৎ বদলে গেল সরমার মুড । স্বর সপ্তমে । বলল, ‘ডাকাতি চলছে, ডাকাতি ।’
থতমত খেয়ে গেলাম । ঘরে-বাইরে দাপট সরমার । কথায় ঝাঁঝ আছে । তবে সাধারণত চিৎকার চেঁচামেচি করে না ও । ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বসে রইলাম ।
বুক খালি করা একটা শ্বাস ফেলল সরমা । অনেকক্ষন টান টান হয়ে বসে থাকলো । লম্বা ড্রয়িং রুমের এধার থেকে ওধার কয়েক বার হাঁটল । একটু বোকা বোকা মুখ করে বললাম, ‘এত রাগছো কেন ! আমি কিছু ভুল বললাম ?’
সরমা নির্বাক । কী যেন ভাবছে ও । ঘরের স্বাভাবিক পরিবেশ হঠাৎ ভারী হয়ে গেল । মনে মনে বললাম, ওঃ, কেন যে ওর ঠকে যাওয়া নিয়ে বলতে গেলাম !
সরমার রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে আছি । কোন্ বাক্যবাণ ধেয়ে আসবে, ভাবছি । অনেকক্ষণ পর সরমা মুখ খুলল, ‘এটা তো লুট চলছে । আমি ঠকেছি, সেটা বড় ব্যাপার নয় ।’
-বড় ব্যাপার কোনটা’ ? অস্ফুটে বললাম ।
-সরকারের লাইসেন্স নম্বর ছাপানো আছে প্যাকেটে । মানে ওদের কাজটা তো বৈধ ।
-বৈধ। সরকারী আইন মতে বেআইনি কিছু নয় ।
সরমার মুখে কথা নেই । অন্য দিন টেবিল সাজিয়ে আমাকে আদেশের সুরে ডাক দেয়, ‘খাবার দিয়েছি । উঠে এসে চেয়ারে বস ।’
আজ মধ্যান্ন ভোজনের কথা ভুলে গেছে ও । বেশ উত্তেজিত । বারবার বলছে, ‘এটা তো অন্যায় । লুট । চাষিরা ঠকছে, আমরাও । লেডিস সার্কেলে জানাতেই হবে...।’
-এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন ?’
-তুমি বুঝবে না । কলেজে এথিক্স পড়াই তো ! আমার কাছে ছেলে-মেয়েরা নীতিশিক্ষার পাঠ নেয় ।
আমি নীরব । সরমা বলে চলেছে, ‘কেনা দামের উপর কতটা লাভ রেখে বিক্রি করবে, তার তো নিয়ম আছে । নিয়ম না-থাকলে তো বলবো লুটের রাজত্ব । ডেসপটিসম ।’
একটু থেমে ক্লাশে লেকচার দেবার ভঙ্গীতে বলে চলেছে সরমা, ‘জাপানে দেখেছি, ওদের স্টিকি রাইসের অনেক দাম । একদম বাজে খেতে । তবু বেশী দাম । কারণ ? ভালো দাম না-পেলে তো চাষিরা কাজ করবে না । তখন ফিয়াট আর টয়েটা খেয়ে কি পেট ভরবে ওদের...?’
-এখানেও তো ভালো দামে শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে ?’ ওর কথার মাঝখানে বলে বসলাম ।
-হ্যাঁ, হচ্ছে । লাভের গুড় খাচ্ছে ব্যবসায়ী ফোরে আর দালাল ।
-অন্য দেশেও তো এরকম হয় ।’ একটু নড়েচড়ে বললাম ।
-হয় । ইউরোপ আমেরিকাতেও চাষিরা আন্দোলন করে । ট্রাক্টর নিয়ে শহরের পথ অবরোধ করে ।’ সরমা উত্তেজিত স্বরে বলেই চলেছে । আবেগ উত্তেজনা ভর করলে মানুষের কথার স্রোত থামে না । সরমা বলেই চলেছে, ‘নাঃ, এরকম লুট কোন স্বাধীন দেশে হয় না । কিছু একটা ...।’
-কী করবে, আন্দোলন ?’
সরমা কী যেন ভাবছে । ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘গত বছর আন্দোলন করতে গিয়ে দেড়শ চাষি মরেই গেল । খেয়াল আছে ?’
সরমা গম্ভীর । থমথমে মুখ । বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বড় একটা শ্বাস ফেলল । তারপর বিড়বিড় করল, ‘হার্টলেস গভরমেন্ট । আমাদের কিছু একটা করা উচিত ।’
-কী করবে ? সরকার আর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ?
-করা তো উচিত ।’ কথাটা বলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সরমা । খানিক পরে বড় একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কিছু তো একটা করবোই । দেখি সার্কেলের অন্য মেম্বাররা কী বলেন !’
-কী আর করবে তোমরা ! নিষ্ঠুর সরকার...একটুতেই গুলি চালিয়ে দেয় ।
সরমা টানটান হয়ে দাঁড়াল । তারপর ধীরে ধীরে মুখ খুলল, ‘কিছু না-পারি, লুটের রাজত্ব চলছে এটা তো বলতে পারি ।’
‘লুটের রাজত্ব’ কথাটা মাথায় ঘুরছে । নির্বাক বসে রইলাম । মনে মনে বললাম, ঠিকই বলেছ সরমা । দেশ জুড়েই চলেছে লুটের রাজত্ব ।

0 মন্তব্য
প্রদর্শন
আড়াল