Published Date:10-10-2021
1596787308.jpg?v=1093433403

গল্প

টিভি

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

বাবা খুব খুশি হয়ে রিতুর কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল,  অনু কি এতো কথা বলছে রে ফোনে ! সকাল থেকে দেখছি ব্যাস্ত    মনে হয় টিভি নিয়ে কিছু কথা হচ্ছে । নতুন টিভি কিনবে নাকি ! রিতু মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল হয়তো তাই, কেন তোমাকে কিছু বলেনি !  না রে বলল না তো । মনে হয় সারপ্রাইজ দেবে । পাল্টা খুশি হওয়ার কথা ছিল রিতুর । কিন্তু উল্টে কেমন একটা মনখারাপ এক ঝটকায় ওর বুকে বিঁধে গেল ।  

 খুশি খুশি ভাবটা বাবার সামনে ধরে রাখতে খুব কষ্ট হচ্ছিল ।  ও একটু ব্যাস্ততার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল, মা ভাত দেবে?  আমার আজ খুব দেরি হয়ে গেল । ঘর থেকে অনু বলল, কেন নিজে নিয়ে নিতে পারছিস না ? জানিস না মা তাড়াতাড়ি কিছু করতে পারে না ।  রিতুর বুকের ভেতর এবার কে যেন জোরসে একটা ফাটল ধরিয়ে দিতে চাইল । সামনে ছড়ানো লম্বা পুরোনো আমলের বারান্দাটা অন্য প্রান্তে রান্নাঘর যেন হঠাৎ করে অনেক অনেক দূরবর্তী ।  ওইখানে মা ভাত বাড়ছে কিনা তার আওয়াজ এখানে এসে পৌঁছুচ্ছে না । একটু আগেই যে ও রান্নাঘর ছেড়ে এসেছে তা যেন অনেক যুগ আগের কোনও ঘটনা । আসলে সকালে রিতু গ্যাসে ভাত চাপিয়ে ছিল ।  সঙ্গে একটি আলুও দিয়ে দিয়েছিল সেদ্ধ হতে । ওর স্কুল ঠিক দশটায় শুরু হলেও নয়টার মধ্যে পৌঁছুতে হয় । মা এসে বলল, কিরে শুধু ভাত খেয়ে যাবি ! দাঁড়া ডাল চাপিয়ে দিচ্ছি । ও, ফ্রিজে মাছ আছে বের কর ভেজে দিচ্ছি ।  

--- না মা মাছ ভাজতে হবে না, ওসব বাসন্তীদি এসে করবে তুমি বরং ডালটা চাপাও আমি স্নানে যাই ।  আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল ।  

---- যা তাড়াতাড়ি স্নান কর গিয়ে, আমি ভাত বেরে রাখছি ।     

সাবেকি বারান্দার সামনে দিয়ে অর্থাৎ বারান্দার শেষ প্রান্তে লাল সিঁড়ির নিচে উঠোন ।  উঠোনে দুচারটে গাছের মাঝখান দিয়ে বাইরে বেরোনোর লোহার গেট । কোনও রকমে দুগ্রাস ভাত পেটে ঠেলে দিয়ে রিতু ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেল ।  বারান্দার পেছনের দিকে যে তিনটে ঘর ও ঠাকুরঘর থাকল এখন তাদের সবগুলিতে একলা বাতাস ঘুরপাক খাচ্ছে । রিতুর বাবা অমলবাবু বারান্দায় রাখা মোরায় বসে খালি গায়ে চেক লুঙ্গি পরে পেপার পড়ছে । অনু ফোনে কথা বলতে বলতে বাথরুমে ঢুকল । মা অর্থাৎ  মনিমা যে এই সময় রান্নাঘরে কি করে কে জানে । যতক্ষণ না বাসন্তীদি আসবে ততক্ষণ এই চলবে । আসলে ত্রিশ বছরের অভ্যেস । এই করতে করতেই হাতে ব্যাথা , পায়ে ব্যাথা সব তবু ওই একটুকরো ঘরই যেন তার অস্তিত্বের সমগ্রটুকু । অনু এইবার এসে বাসন্তীদিকে ঠিক করেছে রান্নার জন্য ।  ও ব্যাঙ্গালোরে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার । দশ লক্ষ দশ হাজার ইয়ারলি প্যাকেজ । এক বছর হল জয়েন করেছে । রীতু এস এস সি দেবে বলে প্রিপারেশন নিয়ে বসেছিল কিন্তু স্কুল সার্ভিসের নাম গন্ধ নেই । একটা প্রাইভেট স্কুলে ঢুকেছে । সি বি এস ই-র এফিলিয়েসন হলে বেতন পনেরো হাজার করে দেবে বলেছে । আপাতত সাত হাজার করে দিচ্ছে ।  রেলের টিটিই পদ থেকে রিটায়ার্ড অমলবাবু যা পেনশন পান তাতে ওনার ভালোই চলে যায় তাই মেয়েদের যার যার টাকা তারতার কাছেই রাখতে বলেছেন । তবু রিতু কখনও ফেরার সময় মায়ের ওষুধ বা বাবার গ্রীনটি আনতে পারলে খুউব খুশি হয় ।  

অনু চাকরি পাওয়ার পর এই নিয়ে তৃতীয়বার এলো  রায়গঞ্জে । আগের বার সবার জন্য জামাকাপড় এনেছিল । সবাই খুব খুশি হয়েছিল ।  যতটা না জামাকাপড় পেয়ে তারচেয়েও বেশি ব্যাঙ্গালোরের আধুনিক ডিজাইনে । রিতু যখন চাকরি পেয়েছিল তখন মা-কে একটা ওয়াটার প্রুফ লিপস্টিক কিনে দিয়েছিল ।  খুব দামি ছিল ওটা, সাতশো টাকা । সেবারও মা খুব খুশি হয়েছিল । ওরকম লিপস্টিক মা কখনও কেনেনি । তবু বলছিল, কি দরকার ছিল রিতু, কোথায় আর যাই আমি । না মা এবার থেকে নেমন্ত্রন খেয়ে আর তোমার লিপস্টিক ধেবরে যাবে না । বাবাও খুব খুশি হয়েছিল নতুন সোয়েটার পেয়ে ।  কিন্তু ওসব খুশির স্মৃতি যেন কেমন আজ ম্লান হয়ে গেল না !  

আসলে মানুষের চাহিদা আনন্দ সবই ভীষণ আপেক্ষিক ।  এই যে মানুষ বলে তাদের প্রাথমিক চাহিদা " রোটি, কাপড়া ঔর মাকান " সত্যিই কি তাই !  কাপড় আর মকান যদি প্রাথমিক চাহিদা হয় তবে মানুষ বাদে অন্য প্রানীদের খাদ্য ছাড়া অন্য চাহিদা নেই কেন ! শরীর ভেতর থেকে রক্ষা করার জন্য খাদ্য, বাইরে থেকে রক্ষা করার জন্য বস্ত্র, প্রাকৃতিক বিপদ থেকে রক্ষা পেতে বাসস্থান, সামাজিক রক্ষা কবজ ধর্ম ।  ধর্ম কি রক্ষাকবচ ? ধর্ম কি জরুরি ? তাহলে আবার একে একে পেছনে যেতে হয় । কি সব আবোল তাবোল ভাবছে রিতু । ভাবনা আসলে এমনই, সূযোগ পেলেই অকারণে নাক গলাবে যেখানে সেখানে ।                

রিতু বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখল বাড়িতে বেশ একখানা কর্মকান্ড চলছে ।  ড্রিল মেশিনের আওয়াজ বাবার ঠাট্টা, অনুর তদারকি । এক লক্ষ টাকা দামের একখানা টিভি এসেছে বাড়িতে ।  বাড়ির তিন নম্বর ঘর অর্থাৎ ড্রইংরুমে লাগানো হচ্ছে মহার্ঘ টিভি । বারান্দায় এক কোনে পরে আছে এতো বছরের পেট মোটা ফ্ল্যাট স্ক্রিন একুশ ইঞ্চি । কত স্মৃতি এটার সাথে ।  রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি ওর আর অনুর । এতোগুলো চ্যানেল তখন এক বিষ্ময়, কেবল কানেকশন ---। টিভিটা কেনার স্মৃতিও কম সুখকর নয় । সে এক গল্প । স্কুল থেকে ম্যাজিক দেখতে নিয়ে যাচ্ছিল সবাইকে ।  রিতু টাইমটা শুনেছিল ভুল । স্কুলে গিয়ে পৌঁছানোর কথা সকাল নয়টায় আর রিতু গিয়েছিল সকাল দশটা । পরে বাড়ি ফিরে বালিশে মুখ গুঁজে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছিল । বাবা দেখে নিয়েছিল আদুরে মেয়ের কান্না । তখন ক্লাস ফোরে পড়ে রিতু ।  বাবা বলল, চল আমরা টিভি কিনে আনি । টিভিতে আমরা ম্যাজিক দেখব, সিনেমা দেখব, গান আরওওও কত্তও কিছু । 

পুরনো টিভির গায়ে  হাত বোলালো রিতু । একটা কষ্ট বুকে দলা পাকিয়ে বসে আছে । ও ঘরে ঢুকল না ।  জামাকাপড় ছেড়ে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল । ওই ঘর থেকে বিভিন্ন কথাবার্তা আর বিরক্তিকর শব্দ ভেসে আসছে । অনেক কিথা, সে সব রিতু বোঝে না, অনু সব বোঝে জানে । প্রায় ঘন্টাখানেক ! আরও বেশি । কখন যে সব থামল, ততক্ষণে রিতুর মাথা ধরে গেছে । ঘুমও আসেনি । মনিমা এসে বলল, কি রে শুয়ে আছিস যে !  খাবি না কিছু ! সকালেও তো ভালো করে খেয়ে যাসনি । শরীর ভালো তো ! মনিমা মাথায় হাত দিল । বলল, নাঃ জ্বর টর তো আসেনি । চল ওই ঘরে দেখ অনু নতুন টিভি নিয়ে এসেছে ।  কেমন হয়েছে দেখবি চল । রিতু উঠে বসল । ওর কেন জানি কান্না পাচ্ছিল । বলল, চল যাচ্ছি । উঠে কিছুক্ষণ বসে থাকল । তারপর ওই ঘরে গিয়ে সোফায় বসল । অমলবাবু বলল, কি রে কোথায় ছিলি!  দেখ অনু কি বিরাট টিভি নিয়ে এসেছে । হ্যা বাবা, অনেক বড় টিভি । বহুকষ্টে বলল রিতু । অনু বলল, কি রে দিদি সারাদিন উপোস দিলি আমার উপর রাগ করে ! সেই নাকের আগায় রাগ-এর অভ্যাস তোর আছেই ।  নে রাগ ছাড়, কি খাবি বল ফোনে অর্ডার করছি । 

দুর রাগ করব কেন !  মাথা ব্যাথা করছিল এসে থেকে তাই শুয়েছিলাম ।  

রাগ তো করেনি রিতু ।  না রাগ নয়, দুঃখ নয় একে কি হীণমন্যতা বলে !  কেউ তো বলে দেয়নি যে আজ রিতু হীণ । বড় মেয়ে হিসেবে বাড়িতে মহার্ঘ টিভিটা তো ওরই কেনার কথা ।  কিন্তু কাকে বলবে এই কথাগুলো ! কেউ নেই যাকে এখন গিয়ে সব জানিয়ে মন হাল্কা করতে পারে । কিছু ভালো মন্দ হলে ও সবার আগে গিয়ে অনুকে বলে কিন্তু মনের এই উদাস ভাব কি করে অনুকে বলবে ?  কি করে বলবে তুই টিভি কিনেছিস বলে আমার মন খারাপ । অনু বলবে, সে কি রে দিদি, তুই এতো হিংসুটি ! না না রিতু হিংসুটি নয় । রিতুর তো শুধু মনে হচ্ছে টিভিটা কেনার কি দরকার ছিল ! ---কেন ?  দরকার ছিল না ? ব্যাকডেটেড টিভিই থাকবে চিরকাল ? সবাই পুরোনো টিভি একসময় পাল্টায়, আমাদের বাড়িতে পাল্টাবো না ? আমার টাকা আছে, অনেক টাকা । আমি কিনতে পারি কিনেছি । হ্যাঁ অনেক টাকা আছে অনুর । রিতুর নেই ।  রিতু সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নয়, সামান্য কটা টাকা বেতন ওর । ছি ছি, কি সব ভাবছে । মনিমা ওর মনের কথাগুলো জানতে পারলে বলবে, তোর মন এতো ছোট! মনিমা ওর আর অনুর মনের কথা কিভাবে যেন পড়ে ফেলে । অনু নিজের মন থেকে ভাবনা গুলো তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফেলতে চাইল । আর এই ভাবনা লুকানোর বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে চুলগুলকে নিয়ে কানের পাশে গুঁজে একটু ক্যাবলা ক্যাবলা হাসা ।  তাই করল রিতু ।                      

মনিমা বলল কি রে তুই বলছিলি না অনু আসলে ডালপুরি বানাবি !  আমি ডাল সেদ্ধ করে রেখেছি ময়দাও মাখা রয়েছে চল এবার কি বানাবি বানিয়ে ফেল ।  বাবাও অন্যদিক থেকে বলল যা যা বানা, তোর হাতে ডালপুরি বহুদিন খাইনি । অনুও যোগ দিল, সত্যিই দিদি আমার জন্য বানাবি !  ওরে বাবা !! 

রিতু রান্নাঘরে গেল ।  সবাই যেনো ওর মন ভোলানোর চেষ্টা করছে । কিন্তু কেন!  ওরা তো বোঝেনি কেন রিতুর মন খারাপ ! নাকি বুঝে ফেলেছে!  বুঝে ফেললে সে আরও লজ্জার । রিতুর খুব কান্না পেল, খুব ।     

সবাই খুব আনন্দ করে ডালপুরি আর আলুর দম খেল ।  টিভিতে আজ ছবি আসছে না । কাল হয়তো ডিস কানেকশন হবে ।  আপাতত টিভিটা চলছে না এটাই স্বস্তি । অনু বলছিল পুরোনো   টিভিটা বিক্রির কথা । মা বলল ওদিকে ডাইনিং টেবিলের সামনে ওটা লাগিয়ে রাখতে ।  আপাতত ওটা রিজেক্ট হচ্ছে না বলেও স্বস্তিটা ফিরে আসছে । 

Comments:

0 মন্তব্য
প্রদর্শন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন