গল্প
পিলসুজের নেভা প্রদীপ
হেমন্ত সরখেল
পিলসুজের ওপরে রাখা দীপটার বয়স ছ'কুড়ি হতে চললো । পিলিভিতের এই বাড়িতে এটাই আনা সম্ভব হয়েছে । বৈমাত্রেয় দেশে বাপ অসম্মানেই বাঁচবে এতে আর দোষ কি !
শশা তুলতে গেছে ছেলে দুটো । সাথে সন্দেহপ্রবণ ওদের মা । রাস্তার পাশেই জমি । ওরা নাকি শশা তুলে আলাদা বস্তায় রাখে,আর মোটরসাইকেলে বস্তা বেঁধে সোজা চালান দ্যায় টনকপুরে । অন্তত প্রদীপের বৌয়ের সেটাই ধারণা । সেজন্যই একপেট পান্তা পুদিনা বাঁটা আর কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে ঠুঁসে এই গরমের জোয়ারে গা ভাসায় শশা খেতের আলে । নিষেক শুরু হলে মালিকের কাজ শেষ, লাগাম মালকিনের হাতে । পেঁপের ডাঁট ছুঁইয়ে ফেরে পুংকেশর আর গর্ভকেশরের গালে ।
আগে এমন ছিল না দরিয়া । শুরুর দিনগুলোতে কখনও কখনও ভাষার পাহাড় আড় হয়ে দাঁড়িয়েছে । বাঙাল প্রদীপ সামনের জনের ঠেট ভোজপুরীতে অসহায় বোধ করেছে । কখনোই বিরক্ত হয়নি দরিয়া । দুবার তিনবারে ভাঙা বাংলায় বোঝাতে চেয়েছে খটমট শব্দের অর্থ । না শোনা থাকলে শুরুর ধাপে যে কোন ভাষাই কঠিন । কখনও বা হাল ছেড়ে হাতের ইশারায় বলেছে, এটা লস্ট কেস, ওর দ্বারা সম্ভব না । প্রদীপ উল্টো চলা শুরু করলো অতঃপর । বৌয়ের সাথে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলা শুরু করলো । অধিকাংশ না বোঝা কথারা নিশুতি পাকদণ্ডী বেয়ে আছড়ে পড়তো দৈহিক নয়ানজুলির পেটে । তখন সব বাঙ্ময়, স্পষ্ট, ঝলমলে । একটা সময়ে দেখা গেল ভাষা আয়ত্বে ওকে ছাপিয়ে গেছে দরিয়া । চমৎকৃত হতো ও সঠিক উচ্চারণে ।
ভোরের আলো বুকে মেখে দুজনে বেরিয়ে যেত নিজেদের কাঠের বাক্স নিয়ে । এলাকা চষে ফেলতো যে যার মতো টায়রা, টিকলি, চেইন, রুজ, নেইলপালিশ, লিপস্টিক, আংটির রকমারি সম্ভারে । একেকদিন একেক গ্রাম, একেক সপ্তাহে একেক শহর । সকাল থেকে সাঁঝ ফেরী আর ফেরী । জমে উঠছিলো ভবিষ্যত । দরিয়া যে সত্যিই দরিয়া সেটা বুঝে উঠতে ওর লেগে গেল পাক্কা পাঁচ বছর ।
এক সকালে বাক্সেরা রইল রাঢ়ী-বইঠখৌকী'র খোলে আর মর্দা-মর্দী গপ্ সেরে একাবন হজারে এক বিঘা খেত কিনে নিল দরিয়া । পনেরো দিনে ঝোপড়ীতে উঠে এল আর সে রাতেই বানিয়ে খাওয়ালো কছুয়ার মিট । জমির পাশ দিয়ে গেছে চওড়া খাল । এটাই পিলিভিতের শ্বাস নলী । ছোট মাছ, কচ্ছপ আর খেতের পানী এখান থেকেই আহরিত হয়ে চলে । পিলিভিত । উদ্বাস্তু প্রদীপের নিজস্ব ঠিঁয়া ।
নদীকে ঘিরেই কথা জন্ম নেয় । জন্ম নেয় খেলাঘর । একটা তিনদিন, ফেরি আটকে রাখলো দরিয়াকে শারদা নদীর কোলে । আসলে, টনকপুরের দৈব মাহাত্ম্য চম্পাবত জেলাকে উৎসাহী করেছে চড়াবা সামগ্রীর ব্যবসায় । দরিয়াও গেল সেখানে । গেল তো গেলই । তিনদিন তার দ্যাখা নেই ! ফিরলো যখন কোঁচড় ভর্তি টাকা । কী ই বা বলার থাকতে পারে প্রদীপের । ফরমান দিলো স্ত্রী,ওকে খেতের দেখভাল করতে হবে । আর ফেরি নয় । সেটা দরিয়াই করতে পারবে । ঐ যায় দরিয়া, ফেরত আসে এই । আবার যায়, আসে । তিন থেকে পাঁচ, পাঁচ থেকে সাত,সাত থেকে পনেরো । অনুপস্থিতির কালো ছায়া আর টাকা বাড়ে । বুলি সেভাবেই কমে মরদের । শারদা'র বর্ফীলা জলে নেয়ে নেয়ে শীতলতর দরিয়ায় উত্তাপ খুঁজে পায় না প্রদীপ । তাতে কী!টাকা আসে টাকা,মুঠো মুঠো টাকা ।
সেবার ফিরে ব্যাঙ্কে গেল । খাতা খুললো । চেক জমা দিলো । আর গেল না । পিলিভিতের রেল কলোনির মুখে গুমটি সাজিয়ে বসলো । টায়রা টিকলি, রুজ । নেইলপালিশ আর লিপস্টিপ । সিঁদুর,নকুলদানা,মিছরি । রাতে ছোট প্লাস্টিকে প্যাকেট করো, দিনে দোকানে রাখো । বজরঙ্গবলী আর শিবশম্ভুর কৃপা বর্ষা আনে অসময়ে । মাস দুয়েকের মাথায় দরিয়াকে খুঁজতে এল ভকতচরণ সেই টনকপুর থেকে ।
পাহাড়ের চূড়ায় টনকপুরের মন্দির । স্থানীয়রা বলেন শক্তিপীঠ । বেয়ে চলা পাহাড়ি রাস্তার মুখে ভকতচরণের দোকান । তারই বারান্দায় পসরা সাজিয়ে বসতো দরিয়া । ও চলে আসায় নাকি বিক্রি কমেছে খোদ মালিকেরই । বলতে এসেছে,ফিরে চল । প্রত্যুত্তরে নতুন খবর শুনলো প্রদীপ । দরিয়া মা 'বনবে' এবার । ভকতচরণ ফিরে গেল হাত কচলে আর, প্রদীপ গুমটি ধরলো । মা হওয়া কি মুখের কথা গো !
শারদা পাহাড়ে থাকে।উছলায়, ছিটকায়, খাঁজের ভেতর থেকে দমকায় । আর আঙিনা জুড়ে ছোটে দরিয়ার যমজেরা । সপ্তাহে দু'দিন ভকতচরণের দোকানে বসে দরিয়া । প্রদীপ কখনো গুমটিতে জ্বলে কখনো নেভে খেতের মিট্টি চাকে ।
ভকতচরণ মানেই নিশ্চিন্তি । ব্যাঙ্কে যে কী জমে তা জানে না প্রদীপ । তবে গহনা বাড়ে মাসে-দুমাসে । বারো বছরে 'জনেঔ' হলো দুটোর । প্রদীপের ক্ষীণ স্বর যজ্ঞোপবীত উচ্চারণেও সমর্থ হলো না । ষোল দিনে যখন ফিরলো ওরা সব সেরে,প্রদীপ সে সন্ধেয় মকাই থেকে ঘুঘু তাড়াতে ক্যানেস্তারা পেটাচ্ছে । পিতৃসত্ত্বা বিচারে বসে দ্যাখে, শক্তিপীঠে মাতারাণীর পায়ের নীচে শিব । কাজেই, প্রদীপের জ্বলা বা না জ্বলায় আটকায় না দরিয়ার বয়ে চলা ।
এক সাঁঝে আবার নতুন খবর পেল প্রদীপ । ছেলে দুটো নাকি ভকতচরণেরই । তাই তো বাপের ঠিঁয়ায় পৈতে ধারণ হলো । মরদ সেজে থাকুক শুধু প্রদীপ । খাওয়া পড়ায় অসুবিধা তো নেই ! শেষটুকু দরিয়াই বুঝে নিতে পারবে । তাছাড়া, ও তো এ দেশেরই নয়, তাহলে অধিকারই বা কোথায় ! নিশুতি রাতে শীশম গাছের নীচে বসে থাকতে থাকতে তন্দ্রা আসলে ও দ্যাখে, দরিয়া স্নান সেরে উঠে আসছে শারদা থেকে । পাথরের ওপর হাতে শুকনো কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে ভকতচরণ । হঠাৎ দরিয়া সাপ হয়ে যায় । বিদ্যুৎ গতিতে পেঁচিয়ে ফ্যালে ভকত'কে । প্যাঁচ পড়ে গলায়, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় । দমবন্ধ হয়ে আসছে । তন্দ্রা ভেঙে ঝিম মেরে বসে থাকে প্রদীপ । গাছের হেলান ভেঙে উঠে দাঁড়ায় । শক্তিপীঠে শক্তিরই অধিকার চালিকার । ওর বারবারের মতো অনুভূত হয়, এ দেশটা ওর নয় । সেই কবে ফটাস করে বাপটা মরে যেতেই ছোট কাকা ওকে তুলে দিয়ে গেল এদেশের পেটে । ওদিকে ফিরতে চেয়ে বিস্তর চড় থাপড় খেয়ে বারো বছরের প্রদীপ এটা জেনে গেল খিদের আদৌ কোন পাকাপাকি দেশ হয় না । তেচোখা মাছের মতো স্রোতের টানে ফিরতে ফিরতে দরিয়াকে বিয়ে করে ওর ঠিঁয়াতেই আস্তানা সাজালো প্রদীপ । ওর ঠিঁয়া । এই ঠিঁয়া । মেজ জ্যাঠা ওকে আলাদীনের গল্প বলেছিল । বলেছিল হাত দিয়ে ঘষলে প্রদীপ গরম হয় । তখন দৈত্য আসে । সব ইচ্ছে পূরণ করে । রাতে প্রাচীন প্রদীপটা নিয়েই শুতো । সাথে চলে এল ওটাও । এটা দেখলে আজকাল ওর মনে পড়ে নৌসাদ, আয়ুব,সীমা'র কথা।হাত দিয়ে ঘষলে প্রদীপের দেহ গরম হয় । নির্জন রাতে গরম প্রদীপটা বুকে চেপে ধরে । ফিসফিস করে বলে,
-- নিয়ে চলো আমায় ময়নামতির চর ।
আকাশে চাঁদের গায়ে ছেঁড়া কাঁথার মতো মেঘ ঝুলে গেলে ঘুম এসে যায় । দৈত্য আসে না ।

0 মন্তব্য
প্রদর্শন
আড়াল